ভারতীয় সংবিধান-রচয়িতারা এদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার উপযােগী করে গড়ে তােলার সুযােগ সৃষ্টির প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রেখেছিলেন। কারণ তারা জানতেন যে, উপযুক্ত শিক্ষার ব্যবস্থা না করতে পারলে সংবিধানের উদ্দেশ্য যতই মহৎ হােক-না-কেন তাকে বাস্তবে রূপায়িত করা যাবে না।

উপরােক্ত পটভূমিকার পরিপ্রেক্ষিতেই ভারতীয় সংবিধানে শিক্ষার মর্যাদাকে বিশ্লেষণ করা উচিত। ভারতীয় সংবিধানে শিক্ষাকে মূলত রাজ্যের দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে ৪২তম সংবিধান-সংশােধনের ধারায় শিক্ষাকে যুগ্ম তালিকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ শিক্ষার দায়িত্ব কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলি যৌথভাবে বহন করবে।

কেন্দ্রীয় সরকার জাতীয় শিক্ষার সমন্বয়মূলক চরিত্র বজায় রাখা, শিক্ষার গুণগতমানের উন্নতিসাধন এবং সমগ্র শিক্ষার প্রয়ােজন মেটানাের দায়িত্ব বহন করবে এবং রাজ্য সরকারগুলিকেও জাতীয় শিক্ষানীতি রূপায়ণে সাহায্য করবে। ভারতীয় সংবিধানের এইরূপ ব্যবস্থাকেই ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে ভারত সরকার কর্তৃক গৃহীত জাতীয় শিক্ষানীতিতে একটি অর্থপূর্ণ অংশীদারিত্ব’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

ভারতবর্ষের সংবিধানে শিক্ষার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকারসমূহ এবং আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষগুলির উপর অর্পণ করা হয়েছে। সংবিধানের সপ্তম তপশিলে শিক্ষা সম্পর্কে তিনটি তালিকা রয়েছে— 

  • কেন্দ্রীয় তালিকা (Union List), 
  • রাজ্য তালিকা (State List) এবং 
  • যুগ্ম তালিকা (Concurrent List)।

সপ্তম তপশিলের দ্বিতীয় তালিকার ১১নং ধারায় শিক্ষাকে রাজ্য সরকারের এক্তিয়ারভুক্ত বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হলেও এই ধারাটি আবার প্রথম ও তৃতীয় তালিকায় উল্লিখিত কতকগুলি শর্তের উপর নির্ভরশীল।

(১) কেন্দ্রীয় তালিকা: যে-সমস্ত বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের, তাকে কেন্দ্রীয় তালিকা বলে। মূল সংবিধানে কেন্দ্রীয় তালিকায় ৯৭টি বিষয় ছিল। বর্তমানে সংবিধান সংশােধনের মাধ্যমে মােট ১০০টি বিষয় আছে। এগুলির মধ্যে উল্লেখযােগ্য হল— প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, রেল, ডাক, মুদ্রাব্যবস্থা, বীমা প্রভৃতি। এই তালিকায় আছে ৬২, ৬৩, ৬৪, ৬৫, ৬৬ নং ধারা।

(২) রাজ্য তালিকা : যে-সমস্ত বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা রাজ্য সরকারের, তাকে রাজ্য তালিকা বলে। মূল সংবিধানে রাজ্য তালিকায় ৬৬টি বিষয় ছিল। বর্তমানে সংশােধনের ফলে ৬১টি বিষয় আছে। এগুলির মধ্যে উল্লেখযােগ্য হল— পুলিশ, আইনশৃঙ্খলা, জনস্বাস্থ্য, স্বায়ত্তশাসন, পূর্ত, কৃষি, মৎস্য চাষ প্রভৃতি। রাজ্য তালিকার মধ্যে আছে ৬৩, ৬৪, ৬৫, ৬৬ নং ধারা।

(৩) যুগ্ম তালিকা : যে-সমস্ত বিষয় আইন প্রণয়নের ক্ষমতা রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার উভয়েরই, তাকে যুগ্ম তালিকা বলে। মূল সংবিধানে রাজ্য তালিকায় ৪৭টি বিষয় ছিল। বর্তমানে সংবিধান সংশােধনের পর এর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৫২ হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযােগ্য হল— শিক্ষা, বিবাহ, বিদ্যুৎ, সংবাদপত্র, বন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ প্রভৃতি। এই তালিকায় আছে ২০, ২৫, ২৬, ২৭, ৩৯, ৪০ নং ধারা।

(১) সংবিধান মান্য করা এবং সংবিধানের আদর্শ ও উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানসমূহ, জাতীয় পতাকা ও জাতীয় স্তোত্রের প্রতি শ্রদ্ধা  প্রদর্শন।

(২) যেসব মহান আদর্শ জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল, সেগুলিকে সযত্নে সংরক্ষণ ও অনুসরণ।

(৩) ভারতের সার্বভৌমত্ব, ঐক্য ও সংহতিকে সমর্থন ও সংরক্ষণ।

(৪) দেশরক্ষা ও জাতীয় সেবামূলক কার্যের আহ্বানে সাড়া দেওয়া।

(৫) ভাষা-ধর্ম-অঞ্চল-শ্রেণি নির্বিশেষে ভারতের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক ঐক্যচেতনা ও ভ্রাতৃত্ববােধ উদবােধন।

(৬) দেশের মিশ্র সংস্কৃতির মূল্যবান উত্তরাধিকারের মাহাত্ম উপলব্ধি ও সংরক্ষণ।

(৭) অরণ্য, হ্রদ, নদনদী, বন্যজীবন-সহ প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন এবং প্রাণীজগতের প্রতি সহানুভূতি পােষণ।

(৮) বিজ্ঞানমনস্কতা, মানবতাবাদ, অনুসন্ধান ও সংস্কারের বিকাশ।

(৯) সরকারি সম্পত্তি রক্ষা করা ও হিংসা পরিহার করা।

(১০) জাতি যাতে নিয়ত কর্মোদ্যম ও সাফল্যের উচ্চস্তরে পৌঁছােতে পারে, জীবনের সর্বক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ও সমবেত প্রয়াসে উৎকর্ষের সেই লক্ষ্যে পৌঁছােনাের প্রচেষ্টা।

(১১) ৬-১৪ বছর বয়স্ক প্রতিটি শিশুকে শিল্পোদ্যোগের ব্যবস্থা করা তার পিতা-মাতা বা অভিভাবকের কর্তব্য।

কর্তব্যগুলি অসম্পূর্ণ, অস্পষ্ট, আবার আদালত কর্তৃক বুলবৎযােগ্য নয়। তা সত্ত্বেও কর্তব্যের গুরুত্বকে অমর্যাদা করা যাবে না। কর্তব্যের ঘােষণার মাধ্যমে নাগরিকদের দায়িত্ববৃদ্ধির পথ প্রশস্ত করা হয়েছে।

Rate this post