ভারতের স্বাধীনতা আইন পাস হয় ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৮ জুলাই। ওই বছরের ১৪ আগস্ট ভারত ও পাকিস্তান দুটি আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। প্রায় তিন বছর ধরে আলাপ-আলােচনার পর ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ২৬ নভেম্বর খসড়া সংবিধানটি গণপরিষদে গৃহীত হয়। সেইসময় গণপরিষদের সভাপতি ছিলেন ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ। গণপরিষদে পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু ভারতীয় সংবিধানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তথা দর্শন কী হওয়া উচিত, সে বিষয়ে ‘Objective Resolution নামে খ্যাত একটি প্রস্তাব পেশ করেন ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ১৩ ডিসেম্বর। বস্তুত ওই প্রস্তাবটিকে সামনে রেখেই ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনাটি (Preamble) রচিত হয়। 

প্রতিটি দেশের সংবিধানে একটি নির্দিষ্ট আদর্শ ও দর্শন প্রতিফলিত হয়। ভারতীয় সংবিধানও এর ব্যতিক্রম নয়। ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনায় অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তাই সাংবিধানিক আদর্শের প্রতিফলন ঘটেছে। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে ৪২তম সংশােধনী প্রস্তাবনায় সমাজতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শব্দদ্বয়ের সংযােজন সংবিধানের লক্ষ্য ও আদর্শকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে— “আমরা, ভারতের জনগণ, ভারতকে একটি সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, সাধারণতন্ত্র রূপে গড়ে তুলতে সত্যনিষ্ঠার সঙ্গে শপথ গ্রহণ করছি এবং তার সকল নাগরিক যাতে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ন্যায়বিচার; চিন্তা, মতপ্রকাশ, বিশ্বাস, ধর্ম এবং উপাসনার স্বাধীনতা; সামাজিক প্রতিষ্ঠা অর্জন ও সুযােগের সমতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং তাদের সকলের মধ্যে ব্যক্তি-সম্ভ্রম ও জাতীয় ঐক্য এবং সংহতি সুনিশ্চিত করে সৌভ্রাতৃত্ব গড়ে তুলতে; আমাদের গণপরিষদে, আজ, ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ২৬ নভেম্বর, এতদ্বারা এই সংবিধান গ্রহণ করছি, বিধিবদ্ধ করছি এবং নিজেদের অর্পণ করছি।”

ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনাকে কে এম মুনসি সংবিধানের ‘রাজনৈতিক গােষ্ঠী বা ঠিকুজি’ (Political Horoscope) বলে ঘােষণা করেছেন অর্থাৎ প্রস্তাবনা হল সংবিধানের রাজনৈতিক উৎস এবং গতিপ্রকৃতির দলিল। আত্মাহীন জীবনের যেমন কোনাে মূল্য নেই, তেমনি প্রস্তাবনাবিহীন সংবিধানও মূল্যহীন। তাই এই প্রস্তাবনা সংবিধানের আত্মা’ (Soul of the Constitution) নামেও পরিচিত।

কোঠারি কমিশন শিক্ষার সঙ্গে জড়িত সংবিধানের কয়েকটি ধারা নিয়ে আলােচনা ও তাদের সুচিন্তিত অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

(১) সংবিধানের ৩০নং ধারায় ভাষা ও ধর্মের জন্য শিক্ষায় বৈষম্য করা। হবে না বলা হয়েছে। কোঠারি কমিশন সুপারিশ করে যে, জাতীয় সংহতি স্থাপনের উদ্দেশ্যে সাধারণ বিদ্যালয়ে সামাজিক কর্মসূচি ব্যবস্থাকে বাস্তবায়িত করতে হবে। সাধারণ বিদ্যালয়গুলির মানােন্নয়ন ঘটাতে হবে। সামাজিক বৈষম্য দূর করতে হলে বিনা বেতনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের পড়াশােনার সুযােগ দিতে হবে। অনগ্রসর সংখ্যালঘু গােষ্ঠীকে বিশেষ উৎসাহ দিয়ে সমপর্যায়ে উন্নীত করতে হবে।

(২) সংবিধানের ৪৪নং ধারায় সারা ভারতে সবার জন্য একই আইন ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে। কোঠারি কমিশন শিক্ষা প্রসঙ্গে। এই ধারার ব্যবহারের উপর গুরুত্ব দিয়েছে।

(৩) সংবিধানের ৪৫ নং ধারায় বলা হয়েছে যে, ১০ বছরের মধ্যে ১৪ বছর বয়সি সব ছেলেমেয়ের শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

কোঠারি কমিশন ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এই লক্ষ্যে পৌছােনাের, কথা ঘােষণা করেছিল। কিন্তু আমরা লক্ষ্যে পৌঁছােতে পারিনি। কেন সংবিধানের নির্দেশ পূরণ করা সম্ভব হল না সে সম্পর্কে কমিশন কয়েকটি কারণ বলেছে—

  • প্রয়ােজনীয় সম্পদ বা সংগতির অভাব।
  • বিপুল জনসংখ্যাবৃদ্ধি।
  • অনুন্নত শ্রেণির মধ্যে নারীশিক্ষায় বাধা।
  • নিম্নশ্রেণির পরিবারের সন্তানসংখ্যা অধিক থাকায় দরিদ্র পিতা-মাতার উৎসাহের অভাবে প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার ঘটেনি। কমিশন বলেছে, প্রতি রাজ্য এমনকি জেলাগুলিকে প্রয়ােজনীয় সুযােগ ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করা হবে। কমিশন মনে করেছিল, অনগ্রসর অঞলে বিশেষ করে শহরাঞ্চলে ১৯৭৫-৭৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এই লক্ষ্যে পৌঁছােনাে যাবে। ১৯৮৫-৮৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে দেশের সমগ্র অনগ্রসর অঞ্চলে ভালাে ও কার্যকরী শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। কমিশন ছাত্র ভরতির সংখ্যাবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অপচয় ও অনুন্নয়ন বন্ধ করার উপায় সম্পর্কেও সুপারিশ করেছে। কোঠারি কমিশন প্রাথমিক শিক্ষাকে প্রাক-প্রাথমিক, নিম্ন-প্রাথমিক, উচ্চ-প্রাথমিক এই তিনটি স্তরবিন্যাসের সুপারিশ করেছে। প্রাথমিক শিক্ষার সূচনা হবে ৬ বছর বয়স থেকে, এর মধ্যে চার বা পাঁচ বছরের নিম্ন-প্রাথমিক এবং তিন বা দু-বছরের উচ্চ-প্রাথমিক স্তর থাকবে। প্রাথমিক শিক্ষার শেষে থাকবে এক থেকে তিন বছরের বৃত্তিশিক্ষা অথবা নিম্ন-মাধ্যমিক শিক্ষা।

(৪) সংবিধানের ৪৬নং ধারা সম্বন্ধে কোঠারি কমিশন অভিমত প্রকাশ করেছে যে, ভারতের দুর্বলতর শ্রেণির বিশেষত তপশিলি জাতি ও উপজাতি শ্রেণির শিক্ষা এবং পিছিয়ে পড়া ও অনুন্নত শ্রেণির নাগরিকদের অবস্থার উন্নতির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তপশিলি শ্রেণি শিক্ষাগত যে সুবিধা ভােগ করছে তা চালু রাখা এবং হােস্টেল নির্মাণের সুপারিশ করা।

এ ছাড়া আবাসিক বিদ্যালয় নির্মাণের বৃত্তি হিসেবে আর্থিক সাহায্য প্রদান, উপজাতিদের ভাষায় শিক্ষাদানের ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আদিবাসীদের জীবনের উপযােগী শিক্ষার বিষয়বস্তু নির্বাচনের ব্যবস্থা নিতে কমিশন সুপারিশ করে।

Rate this post