নাটক (Drama) = সাহিত্যের একটি বিশেষ ধরণ। সাধারণত একটি লিখিত পাণ্ডুলিপি অনুসরণ করে অভিনয় করে নাটক পরিবেশিত হয়ে থাকে।নাটকে স্থান, সময় ও পরিবেশের বর্ণনা ছাড়াও সংলাপ লেখা থাকে।

ত্রিমাত্রিক আয়তনে দর্শকদের সামনে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মাধ্যমে সমাজের কিছু ঘটনা বা কোন একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে যোগাযোগ মাধ্যম সৃষ্টি করা হয়,তাকে নাটক বলে ।

নাটকের শ্রেণীবিভাগ
নাটকের শ্রেণীবিভাগ কোনো বিশেষ বিষয়কে ভিত্তি করে করা হয়নি। নানারকম বিষয়বস্তু অনুসারে নাটককে নানাভাবে শ্রেণীবিভাগ করা হয়েছে।


নাটকের শ্রেণীবিভাগগুলো এরকম:
ক) ভাব সংবেদনা রীতি অনুসারে

  • (০১) ট্রাজেডি
  • (০২) কমেডি
  • (০৩) ট্রাজি-কমেডি
  • (০৪) মেলোড্রামা ও
  • (০৫) ফার্স।


খ) বিষয়বস্তুর উৎসরীতি অনুসারে

  • (০১) পৌরাণিক
  • (০২) ঐতিহাসিক
  • (০৩) ঐতিহাসিককল্প চরিত্রমূলক
  • (০৪) সামাজিক
  • (০৫) পারিবারিক
  • (০৬) উপকথাশ্রয়ী ও
  • (০৭) কাল্পনিক


গ) বিষয়বস্তুর প্রকৃতি অনুসারে

  • (০১) ধর্মমূলক
  • (০২) নীতিমূলক
  • (০৩) আধ্যাত্মিক
  • (০৪) রাজনৈতিক
  • (০৫) অর্থনৈতিক
  • (০৬) প্রেমমূলক
  • (০৭) দেশপ্রেমমূলক
  • (০৮) সমাজরীতিমূলক
  • (০৯) ষড়যন্ত্রমূলক
  • (১০) রোমাঞ্চকর দুঃস্বাহসমূলক ও
  • (১১) অপরাধ আবিষ্কারমূলক প্রভৃতি


ঘ) উপাদানযোজনা বৈশিষ্ট্য অনুসারে

  • (০১) গীতিনাট্য বা অপেরা
  • (০২) যাত্রা
  • (০৩) নৃত্যনাট্য
  • (০৪) নাটক বা ড্রামা


ঙ) আয়তন বা অঙ্কসংখ্যা অনুসারে

  • (০১) মহানাটক
  • (০২) নাটক
  • (০৩) নাটিকা
  • (০৪) একাঙ্কিকা


চ) গঠন রীতি অনুসারে

  • (০১) ক্লাসিক্যাল
  • (০২) রোমান্টিক
  • (০৩) দৃশ্যাবলী


ছ) রচনারীতি অনুসারে

  • (০১) পদ্যনাটক
  • (০২) গদ্যনাটক
  • (০৩) গদ্য-পদ্যময় নাটক


জ) উপস্থাপনারীতি অনুসারে

  • (০১) বাস্তবিক নাটক
  • (০২) ভাবতান্ত্রিক নাটক
  • (০৩) রূপক নাটক
  • (০৪) সাংকেতিক নাটক
  • (০৫) এক্সপ্রেশানিস্টিক নাটক


ঝ) উদ্দেশ্য অনুসারে

  • (০১) ঘটনামূখ্য (মোলোড্রামা)
  • (০২) চরিত্রমূখ্য (চরিত্রনাট্য)
  • (০৩) রসমূখ্য (রসনাট্য) ও
  • (০৪) তত্ত্বমূখ্য (তত্ত্বনাটক)

 

বাংলা নাটকের ইতিহাস :-

আমরা সবাই কম-বেশি নাটক দেখেছি, কখনো মঞ্চে বা টেলিভিশনে, কখনো বা নাটক শুনেছি রেডিওতে। আপনিও নিশ্চয়ই নাটক দেখেছেন, কিংবা শুনেছেন। অতীতকালে নাটক কেবল দেখারই বিষয় ছিল। 

প্রাচীন ভারতে নাটককে বলা হতো দৃশ্যকাব্য কিন্তু আধুনিককালে প্রচার মাধ্যমের স্মৃতির ফলে এখন নাটক শোনারও বিষয় হয়েছে। যেমন আমরা নাটক শুনি রেডিওতে, কখনো বা ক্যাসেট প্লেয়ারে। আপনিও তো নাটক দেখেছেন কিংবা শুনেছেন।
কিন্তু বলতে কি পারবেন, নাটক কাকে বলে? নাটকের বৈশিষ্ট্য কি? প্রশ্নটা একটু জটিল হলো, তাই না? তাহলে আলোচনার মাধ্যমে দেখাই যাক বিষয়টা কতটা সহজ সরল ভাবে আমরা কিভাবে বুঝতে পারি।
বাংলা সাহিত্যে বাংলা নাটক এর উদ্ভব ১৮৫২ খৃষ্টাব্দে। নাটক জীবনের দর্পণ। জীবনকে প্রত্যক্ষত দেখতে, জানতে, বুঝতে নাটকের বিকল্প নেই। দেশ কাল-সমাজ ও সমাজ-আশ্রিত জীবন নাটকে প্রতিফলিত হয়। নাটক মিশ্রকলা একাধারে যেমন পাঠ্য আবার অভিনয়েও বটে। প্রাচ্য নাট্যশাস্ত্রী ভরত-এর মতে, নাটক হল সর্ব শাস্ত্র, শিল্প, কর্ম ও বিদ্যার সমন্বয়ে রচিত। নাটক জীবন নিয়ে রচিত। তাই সমাজের জীবনের নানা সমস্যা ও সংকটের শিল্পীত রূপ নাটকে প্রতিফলিত হয়।
বাংলা সাহিত্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শাখা হচ্ছেবাংলা নাটক। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, ছড়া, প্রবন্ধ, সাহিত্যের এইসব বিচিত্র শাখার মধ্যে নাটক এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্পমাধ্যম। দেখা ও শোনার যুগপৎ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই গড়ে ওঠে একটি প্রকৃত নাটক। অর্থাৎ নাটক একই সঙ্গে দেখা ও শোনার বিষয়। এই দুটি মৌল বিষয় নাটকের প্রধান শিল্প বৈশিষ্ট্য হলেও, আমরা নাট্যগ্রন্থ পাঠ করেও সাহিত্য রস আস্বাদন করতে পারি।

নাটকের সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য :-

আমরা নিন্মোক্ত ভাবে নাটকের সংজ্ঞা দিতে পারি –

মঞ্চে অভিনেতা অভিনেত্রীদের সাহায্যে মানবজীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা যখন সংলাপের আশ্রয়ে দর্শকের সামনে উপস্থিত করা হয়, তখন তা হয়নাটক

রঙ্গমঞ্চে অভিনয়ের উপযোগী করে যে সাহিত্য রচিত হয়, তাকে সাধারণত:নাটকবলে।

ইংরেজিতে বলা হয় –

“Drama is the creation and representation of life in terms of theater”

আধুনিক সুপ্রসিদ্ধ নাট্যকার Granville Barker নাটকের সংজ্ঞা নির্দেশ করিতে গিয়ে বলেছেন,—

“A play is anything that can be made effective upon the stage of a theater by human agency. And I am not sure. that this definition is not too narrow”.

‘নাটক’ শব্দটির মধ্যেই রয়েছে সত্যের ইঙ্গিত। নট, নাট্য, নাটক এ তিনটি শব্দেরই মূল হলো নট। আর নট্ এর অর্থ হলো নড়াচড়া করা, অঙ্গচালনা করা ইত্যাদি। নাটকের ইংরেজি প্রতিশব্দ Drama’-র মধ্যেও একই সত্য আমরা খুঁজে পাই Drama শব্দের মূলে রয়েছে গ্রীক শব্দ Dracin, যার অর্থ ‘to-do” অর্থাৎ কিছু করা।

নাটককে জীবনের দর্পণ বলা হয়। মানব জীবনের প্রতিদিনের ঘটনার শৈল্পিক অভিব্যক্তিই প্রকাশ পায় নাটকে। শৈল্পিক প্রকাশ এই অর্থে যে, প্রতিদিনের গতানুগতিক স্রোতধারায় ঘটে যাওয়া তুচ্ছ, অস্পষ্ট ঘটনাগুলোই সংলাপে মুখর হয়ে, সাহিত্যরসে সিঞ্চিত হয়ে, ভাববাঞ্ছনায় উদ্ভাসিত হয়ে নাটকে নবরূপ পায়। নাট্যকার মানব জীবনের হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বিরহ, দ্বন্দ্ব-সংঘাত নাটকের মাধ্যমে তুলে ধরেন বলে- নাটককে বলা হয় জীবনের প্রতিচ্ছবি। শ্রেণি অনুযায়ী বিভিন্ন প্রকার নাটকের বৈশিষ্ট্য বিভিন্ন রকম। তবে নাটকের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ।

নাটকের বৈশিষ্ট্য :-

  • নাটক জীবনেরই সুদৃশ্য রূপায়ণ। দর্শন এবং শ্রবণ-ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বলে নাটককে একই সাথে দৃশ্যকাব্য ও শ্রব্যকাব্য বলা হয়ে থাকে।
  • নাটকের মধ্যে নাট্যকারের বলিষ্ঠ জীবনবোধ, জীবনদর্শন ও বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়।
  • সংলাপ এবং নাটকীয়তা হলো নাটকের প্রাণ। নাটকের আখ্যানভাগকে ভিত্তি করে কুশীলবদের চরিত্র ও সংলাপের মধ্য দিয়ে নাটকের নাটকীয়তা সৃষ্টি করা হয়।
  • একটি সার্থক নাটকে ৫টি অংক এবং প্রতি অংকে ৩টি করে সর্বমোট ১৫টি দৃশ্য থাকে।
  • অংক ৫টিতে ঘটনা বিন্যাসের ৫টি বিশেষ পর্যায় বা অবস্থা সংস্থাপিত হয়। যেমন- প্রারম্ভ, প্রবাহ, উৎকর্ষ, গ্রন্থিমোচন এবং উপসংহার।
  • নাটক অভিনয় নির্ভর। অভিনেতা নিজেকে রূপান্তরিত করে নির্দিষ্ট চরিত্রের সাথে এক হয়ে যান। তাই নাটক হচ্ছে Imitation of life.
  • নাটককে Collective Art বলা হয়ে থাকে। কারণ, এতে একটি আখ্যানভাগের উপজীব্যে রঙ্গমঞ্চের পরিসরে পাত্র পাত্রীর সংলাপ ও অভিনয়ের মধ্যদিয়ে গতিমান মানব জীবনের শিল্পীত প্রকাশ ঘটে থাকে।
  • নাটকে ঘটনার দ্বন্দ্ব নাটকীয় দ্বন্দ্বে রূপায়িত হয়। তখনই নাটকে আসে দুর্বার গতি।

বিভিন্ন নাটকের সংজ্ঞা :-

পৌরাণিক নাটক :-

পৌরাণিক কোন কাহিনী বা চরিত্রকে কেন্দ্র করে যখন কোন নাটক রচিত হয়, তখন তাকেপৌরাণিক নাটক বলে। রামায়ন, মহাভারত, ভাগবত পুরাণ বা অন্য কোন ধর্মমূলক কাহিনী অবলম্বনে পৌরাণিক নাটক লিখিত হয়।

ঐতিহাসিক নাটক :-

অতীতের কোন ঘটনা বা ইতিহাসের কোন চরিত্র অবলম্বনে যখন নাটক লিখিত হয়, তাকেঐতিহাসিক নাটকবলে। শেক্সপীয়রের Henry IV, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘সাজাহান’, শচীন সেনগুপ্তের ‘সিরাজউদ্দৌলা’, সিকান্দার আবু জাফরের ‘সিরাজ-উ-দ্দৌলা’ প্রভৃতি ঐতিহাসিক নাটকের উদাহরণ।

সামাজিক নাটক কাকে বলে এবং এর বৈশিষ্ট্য :-

সমাজের কোন সমস্যা নিয়ে রচিত নাটককেসামাজিক নাটকবলা হয়। সামাজিক নাটকে সমাজের মৌল প্রবণতা এবং নানা অনুষদের প্রতি নাট্যকারকে সতর্ক থাকতে হয়। এ ধরনের নাটকে সমাজের দুই পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও বিরোধ দেখা দেয় পরিণতিতে অশুভ পতন দেখানো হয়। বার্ণার্ড শ’র Heart – break House, দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ, নুরুল মোমেনের ‘রূপান্তর’ প্রভৃতি সামাজিক নাটকের উদাহরণ।

কমেডি নাটক কাকে বলে :-

‘কমেডি’ কথাটির উৎপত্তি ‘কোমাস’ শব্দ থেকে ডাওনিসাস দেবতার উপাসনার জন্য প্রাচীন গ্রীসে যে আনন্দো উন্মত্ত শোভাযাত্রা হত তার নাম ছিল কোমাস। শোভাযাত্রার সময় অনেকে নানারকমের পোশাক পরে হাস্য-পরিহাস করতে করতে নাট্য অভিনয় করত। এই কারণেই হাস্য-রসাত্মক নাটক গুলোকে ‘কমেডি’ নামে আখ্যা করা হত।

এরিস্টটল কমেডির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে লিখেছেন,

“A comedy is an imitation of men worse however, not as regards any and every sort of fault; but only as regards particular kind, the ridiculous, which is a species of the ugly, the ridiculous may be defined as a mistake or deformity not productive of pain or harm to others”

খ্রিঃ ৪র্থ শতকের নাট্যপ্রবক্তা এলিয়াস ডোনেটাস লিখেছেন,

“Comedy is a story treating of various habits and customs of public and private affairs, from which one may learn. What is of use in life, on the other hand and what must he avoided on the other”

কমেডির স্বরূপ ও লক্ষণ-বৈশিষ্ট্য যদি আমরা বিচার করি তাহলে দেখা যায় যে ‘কমেডি’ বলতে কেবল স্থূল হাস্যরস যুক্ত নাটক বুঝায় না, গুরু গম্ভীর ও সমস্যাপূর্ণ জীবনের রূপায়ণ ও তার মিলন অস্ত পরিবেশকে বুঝিয়ে থাকে।

নাটকের উপাদান কয়টি ও কি কি :-

নাটকের ৬ টি উপাদানের কথা এরিস্টটল বলেছেন। যথা-

১ – কাহিনী
২ – চরিত্র
৩ – ভাবনা
৪ – সংলাপ
৫ – দৃশ্য
৬ – সঙ্গীত ৷

আবার অনেকের মতে প্রত্যেক নাটকের মধ্যে প্রধান চারটি উপাদান থাকে। এগুলো হচ্ছে :-

১ – কাহিনী বা বিষয়,
২ – চরিত্র,
৩ – সংলাপ এবং
৪ – ঘটনা-সমাবেশ।

নাটক তৈরির সময় একজন নাটক রচনাকারিকে এই উপাদান ৪ টির প্রতি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে লক্ষ্য রাখতে হবে।

নাট্যকার অভিনেতার জন্য এমন কতকগুলি কথার সৃষ্টি করেন, যার সাহায্যে অভিনেতারা তাদের গৃহীত চরিত্রকে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলেন । যখন সেই কথাগুলিকে একত্র করে একটি কাহিনীর মধ্যে দিয়ে দর্শকদের দেখানো হয়, তখন তার মধ্যে বেশ একটা সামঞ্জ্য ফুটিয়ে ওঠে। এই সামঞ্জস্যই নাটকের পক্ষে একটি আকর্ষণীয় বিষয়।

কাহিনী চরিত্র গুলির প্রয়োজনয়ীতা ঘোষণা করে, চরিত্রগুলি কাহিনীকে প্রকাশ করে, উপযুক্ত ঘটনা-সমাবেশে চরিত্র ও কাহিনী মধ্যে মূর্ত হয়ে ওঠে। আবার সংলাপ চরিত্রকে মুখর করে তোলে ।

নাটকের গঠন কৌশল :-

কাহিনী, চরিত্র, ঘটনা-সমাবেশ এবং সংলাপ – এগুলি নাটকের প্রধান উপাদান। কিন্তু এই উপাদানগুলি থাকলেই যে, যে কোন কথোপকথন মূলক রচনা নাটক হয়ে উঠবে, এমন কোন কথা নাই। এই বিচ্ছিন্ন অংশগুলি একত্রে গ্রথিত হয়ে নাট্য অভিনয় কালে যদি তা দর্শকদের মনে এক ভাবরসের সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়, তবেই তাকে নাটক বলা যেতে পারে। এই বিচ্ছিন্ন অংশগুলিকে সমষ্টিগতভাবে রসস্থ করে তোলা নাট্যশাস্ত্রসম্মত কয়েকটি নিয়ম আছে। একেই নাটকের গঠন কৌশল

বলে।

নাট্যমঞ্চে অভিনেতা কর্তৃক নাট্যাভিনয়ের মাধ্যমে গতিশীল মানবজীবনের প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তোলাকে নাটক বলে।

নাটক সম্পর্কে  বিস্তারিত আলোচনা 

নাটক কি বা কাকে বলে?

নাটক সাহিত্যতত্ত্বের একটি পারিভাষিক শব্দ। নাটকের অপর নাম দৃশ্যকাব্য।  কোনো দ্বন্দ্বমূলক আখ্যান যদি চরিত্রসমূহের সংলাপের মাধ্যমে মূর্ত হয়ে উঠে তাহলে তাকে নাটক বলে। নাটকে কাহিনী থাকে তবে, নাটকে কাহিনীর চেয়ে মুখ্য চরিত্রসমূহের দ্বন্দ্ব। নাটকের মূল অঙ্গ হচ্ছে কাহিনী, চরিত্র, ঘটনাসমাবেশ ও সংলাপ।

সহজ ভাষায় বললে, মানুষের সুখ-দুঃখকে রঙ্গমঞ্চে স্বাভাবিক অভিনয়ের মাধ্যমে প্রকাশ করাকে নাটক বলে। নাটক সংলাপ এবং অভিনয়ের মাধ্যমে মঞ্চে প্রদর্শিত হয়ে থাকে।

 নাটক কত প্রকার ও কী কী?

বাংলা নাটককে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-

১) রসপ্রধান।

২) রূপপ্রধান।

 

রসপ্রধানকে আবার চারভাবে ভাগ করা হয়েছে। যথা-

১) ট্রাজেডি।

২) মেলোড্রামা।

৩) কমেডি।

৪) ফার্স/প্রহসন।

 

রূপপ্রধানকে আবার দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা-

১) গীতিনাট্য।

২) নৃত্যনাট্য।

 

নাটকের উপাদান কয়টি ও কি কি?

এরিস্টটলের মতে, নাটকের উপাদান ৬টি। যথা-

১) কাহিনী।

২) চরিত্র।

৩) সংলাপ।

৪) দৃশ্য।

৫) ভাবনা।

৬) সঙ্গীত।

 

আবার অনেকের মতে, প্রত্যেক নাটকে প্রধান চারটি উপাদান থাকে। যথা-

১) কাহিনী বা বিষয়।
২) চরিত্র।
৩) সংলাপ।
৪) ঘটনা-সমাবেশ।

 

বাংলা নাটক প্রথম অভিনীত হয় কবে?

বাংলা নাটক প্রথম অভিনীত হয় ১৭৯৫ খ্রিষ্টাব্দ। হেরাসিম লেবেডেফ নামে রাশিয়ান এক ব্যক্তি প্রথম The Disguise এবং Love is the best Doctor নামে দুইটি নাটক বাংলায় অনুবাদ করে এদেশের পাত্র-পাত্রীর দিয়ে অভিনয় করান।

 

বাংলা নাটক প্রথম মঞ্চে অভিনীত হয় কবে?

বাংলা নাটক প্রথম মঞ্চে অভিনীত হয় ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দে।

 

কলকাতার লালবাজারে ‘প্লে-হাউজ’ এ প্রথম রঙ্গমঞ্চ তৈরি হয় কবে?

কলকাতার লালবাজারে ‘প্লে-হাউজ’ এ প্রথম রঙ্গমঞ্চ তৈরি হয় ১৭৫৩ খ্রিষ্টাব্দ।

 

প্রথম বাংলা মৌলিক নাটক কোনটি?

তারাচরণ শিকদার রচিত ‘ভদ্রার্জুন’ হচ্ছে প্রথম বাংলা মৌলিক নাটক।  এটি ১৮৫২ সালে রচিত হয়।  এটি বাঙালি কর্তৃক রচিত প্রথম কমেডি নাটক। এ নাটকের মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে অর্জুন দ্বারা সুভদ্রা হরণের কাহিনী। মহাভারত থেকে এ নাটকের কাহিনী সংগ্রহ করা হলেও এ নাটকে বাঙালি সমাজের বাস্তব পরিবেশ অঙ্কিত হয়েছে।

 

বাংলা ভাষার প্রথম সার্থক ও আধুনিক নাটক কোনটি?

বাংলা ভাষার প্রথম সার্থক ও আধুনিক নাটক হচ্ছে ‘শর্মিষ্ঠা’। ১৮৫৯ সালে মাইকেল মধুসূদন দত্ত এই নাটক রচনা করেন।  পুরাণের কাহিনী অবলম্বনে এ নাটক রচিত হয়েছে।

 

বাংলা ভাষার প্রথম সার্থক ট্রাজেডি নাটক কোনটি?

বাংলা ভাষার প্রথম সার্থক ট্রাজেডি নাটক হচ্ছে ‘কৃষ্ণকুমারী’। ১৮৬১ সালে মাইকেল মধুসূদন দত্ত এই নাটক রচনা করেন।   উইলিয়াম টডের ‘রাজস্থান’ গ্রন্থ থেকে এ নাটকের কাহিনী সংগ্রহ করা হয়েছে।  এ নাটকের বিখ্যাত চরিত্র হচ্ছে- কৃষ্ণকুমারী, মদনিকা, ভীমসিং, বিলাসবতী।

 

বাংলা ভাষার প্রথম সার্থক কমেডি নাটক কোনটি?

বাংলা ভাষার প্রথম সার্থক কমেডি নাটক হচ্ছে ‘পদ্মাবতী’। ১৮৬০ সালে মাইকেল মধুসূদন দত্ত এই নাটক রচনা করেন।  গ্রিক পুরাণের Apple of Discord অবলম্বনে মাইকেল মধুসূদন দত্ত এই নাটক রচনা করেন।

 

বাংলা ভাষার মুসলমান রচিত প্রথম নাটক কোনটি?

বাংলা ভাষার মুসলমান রচিত প্রথম নাটক হচ্ছে ‘বসন্ত কুমারী’। ১৮৭৩ সালে মীর মশাররফ হোসেন এই নাটক রচনা করেন।  এ নাটকের মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে- বৃদ্ধ রাজা বীরেন্দ্র সিংহের যুবতী স্ত্রী রেবর্তী সপত্নী পুত্র নরেন্দ্র সিংহকে প্রেম নিবেদন করেন। কিন্তু নরেন্দ্র সিংহ এই প্রেম প্রত্যাখান করেন। প্রেমে প্রত্যাখাত হয়ে রেবর্তী ষড়যন্ত্র শুরু করে। এ কারণে সমগ্র রাজ পরিবারটি ধ্বংস হয়ে যায়।

 

বাংলা ভাষায় মুসলমান চরিত্র অবলম্বনে প্রথম নাটক কোনটি?

বাংলা ভাষায় মুসলমান চরিত্র অবলম্বনে প্রথম নাটক হচ্ছে ‘জমীদার দর্পণ’। ১৮৭৩ সালে মীর মশাররফ হোসেন এই নাটক রচনা করেন।  এই নাটকের মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে- জমিদার হায়ওয়ান আলীর অত্যাচার ও অধীনস্ত প্রজা আবু মোল্লার গর্ভবতী স্ত্রী নূরন্নেহারকে ধর্ষণ এবং হত্যার কাহিনী।

 

বাংলা নাট্যসাহিত্যে প্রথম ট্রাজেডি রচনার প্রচেষ্টা কোনটি?

বাংলা নাট্যসাহিত্যে প্রথম ট্রাজেডি রচনার প্রচেষ্টা হচ্ছে কীর্তিবিলাস’ । ১৮৫২ সালে যোগেন্দ্রচন্দ্র গুপ্ত এই নাটকটি রচনা করেছেন।   সপত্নীপুত্রের প্রতি বিমাতার অত্যাচারের কাহিনী অবলম্বনে এটি রচিত হয়েছে।  বিভিন্ন চরিত্রের মৃত্যুর মাধ্যমে ট্রাজেডির রূপায়ণ এ নাটকের বৈশিষ্ট্য।

 

ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রথম নাটক কোনটি?

ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রথম নাটক ‘নীলদর্পণ’। ১৮৬০ সালে দীনবন্ধু মিত্র এই নাটক রচনা করেছেন।  এ নাটকটি প্রথম মঞ্চায়ন হয় ঢাকায়। এ নাটক দেখতে গিয়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মঞ্চের অভিনেতাদের লক্ষ্য করে জুতা ছুড়ে মেরেছিলেন। এ নাটকে মেহেরপুরে কৃষকদের ওপর নীলকরদের নির্মম নির্যাতনের চিত্র ফুটে উঠেছে। মাইকেল মধুসূদন A Native ছদ্মনামে ইংরেজিতে The Indigo Planting Mirror নামে অনুবাদ করেন। এ নাটকের বিখ্যাত চরিত্র হচ্ছে- নবীন মাধব, তোরাপ ।

 

 বাংলা ভাষার প্রথম সাংকেতিক নাটক কোনটি?

বাংলা ভাষার প্রথম সাংকেতিক নাটক হচ্ছে ‘শারদোৎসব’। এটি ১৯০৮ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেছেন।

 

ট্রাজেডি, কমেডি ও ফার্সের মূল পার্থক্য কোথায়?

ট্রাজেডি, কমেডি ও ফার্সের মূল পার্থক্য হচ্ছে জীবনানুভূতির গভীরতায়।

 

 

বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত নাটক

তারাচরণ শিকদার- ভদ্রার্জুন। ১৮৫২ সালে এই নাটকটি রচিত হয়েছে। এটি বাঙালি দ্বারা বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম নাটক।

 

যোগেন্দ্র গুপ্ত- কীর্তিবিলাস। ১৮৫২ এই নাটকটি রচিত হয়েছে। এটি বাংলা নাট্যসাহিত্যে প্রথম ট্রাজেডি নাটক।

 

রামনারায়ণ তর্করত্ন- ‘কুলীনকুল সর্বস্ব’ ১৮৫৪। এটি কৌলিন্য প্রথা অবলম্বনে রচিত। ‘বেণী সংহার’, ‘যেমন কর্ম তেমন ফল’ (প্রহসন), ‘উভয়সঙ্কট’ (প্রহসন)।

 

মাইকেল মধুসূদন- ‘শর্মিষ্ঠা’,  ‘মায়াকানন’ ‘কৃষ্ণকুমারী, ‘পদ্মাবতী’,।

 

গিরিশচন্দ্র ঘোষ- প্রফুল্ল’ (১৮৮৯):  এটি গিরিশচন্দ্র ঘোষের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ বিয়োগান্তক নাটক । ‘সীতাহরণ,, সিরাজদ্দৌলা, সীতার বনবাস।

 

দীনবন্ধু মিত্র- নীলদর্পণ’: এটি ঢাকার বাংলা প্রেস থেকে প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থ। ‘কমলে কামিনী, ‘নবীন তপস্বিনী,  ‘জামাই বারিক, ‘লীলাবতী’।

 

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়-

ঐতিহাসিক নাটক: ‘সাজাহান’,  ‘দুর্গাদাস’, ‘নুরজাহান’, ‘প্রতাপসিংহ’, ‘তাপসী, ‘তারাবাঈ’, ‘মেবারপতন’, ।

রোমান্টিক ও পৌরাণিক নাটক: ‘সীতা’,   ‘ভীষ্ম’, ‘সোহরাব-রুস্তম’,  ‘সিংহলবিজয়’, ‘চন্দ্ৰগুপ্ত’ ।

কাব্যনাট্য: ‘পাষাণী’।

সামাজিক নাটক: ‘পরপারে’,  ‘বিরহ’, ‘প্রায়শ্চিত্ত’, ‘বঙ্গনারী’,  ‘কল্কি অবতার’,‘আনন্দ বিদায়’।

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর:

বাল্মীকি প্রতিভা’: প্রথম প্রকাশিত নাটক। অধিকাংশের মতে- ‘রুদ্রচণ্ড’।

রূপক ও সাংকেতিক নাটক: ‘ডাকঘর’, ‘তাসের দেশ’, ‘প্রকৃতির প্রতিশোধ’, ‘কালের যাত্রা’, ‘রাজা ও রানী’,  ‘অচলায়তন’, ‘রক্তকরবী’ ‘রাজা’, ।

নৃত্যনাট্য: ‘চিত্রাঙ্গদা’, ‘শ্যামা”  ‘চণ্ডালিকা’, ‘নটীর পূজা’, ।

কাব্যনাট্য: ‘মায়ার খেলা’,  ‘বিদায় অভিশাপ’ ‘প্রকৃতির প্রতিশোধ’, ।

অন্যান্য নাটক: ‘বিসর্জন’,‘  ‘বসন্ত’ ‘চিরকুমার সভা’, বৈকুণ্ঠের খাতা’, ।

 

কাজী নজরুল ইসলাম- ‘ঝিলিমিলি’: এটি ৩টি নাটকের সংকলন এবং প্রথম নাট্যগ্রন্থ। ‘মধুমালা’ ‘আলেয়া’, ‘পুতুলের বিয়ে’।

 

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়- ‘ষোড়শী’,  ‘বিজয়া’, ‘রমা’।

 

মুনীর চৌধুরী- ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’: এটি তাঁর রচিত প্রথম নাটক। ‘কবর’: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত ‘মানুষ’,‘দণ্ডকারণ্য’, ‘নষ্ট ছেলে’, ‘চিঠি’, ‘পলাশী ব্যারাক ও অন্যান্য’।

 

সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ-তরঙ্গভঙ্গ’,‘উজানে মৃত্যু’,  ‘বহিপীর’, ‘সুড়ঙ্গ’।

 

সিকানদার আবু জাফর- ‘সিরাজ-উদ্-দৌলা’, ‘মহাকবি আলাওল’।

 

অমৃতলাল বসু- ‘বিবাহ বিভ্রাট’,   ‘চোরের উপর বাটপারি’, ‘ডিসমিস’ ‘কৃপণের ধন’ (সবগুলোই প্রহসন) ।

 

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর– ‘পুরুবিক্রম নাটক’, ‘কিঞ্চিত জলযোগ’ (প্রহসন)।

 

মামুনুর রশীদ- ‘গিনিপিগ’, ‘ওরা কদম আলী’, ‘ইবলিশ’।

 

আব্দুল্লাহ আল মামুন- ‘সুবচন নির্বাসনে’, ‘কোকিলারা” ।

 

ক্ষীরোদপ্রসাদ- ‘আলিবাবা’, ‘রঘুবীর’।

 

জিয়া হায়দার- ‘এলেবেলে’

 

হানিফ সংকেত- শোধ-বোধ।

5/5 - (1 vote)