একটি বনভোজন

জনপদ থেকে দূরে কোনাে এক বন-বৃক্ষলতায় আচ্ছাদিত পরিবেশে আনন্দের যে ভােজন হয় তাই সাধারণত বনভােজন। বনভােজন হতে পারে যেকোনাে রিসাের্টে, যে কোনাে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে কিংবা শহরের কোণ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া নদীর তীরে কিংবা নদীর বুকে জেগে ওঠা চরে । একথা ঠিক যে, বনভােজন যে কোনাে মানুষের নিকট একটি আনন্দের বিষয় । পুরাে বছরের কর্মক্লান্তি দূর করতে বনভােজনের মতাে উপযুক্ত দাওয়াই আর কিছু হতে পারে না। সচরাচর শীতকালেই বেশি বনভােজনের আয়ােজন করা হয়। বেশ কয়েকদিন থেকেই আমাদের বন্ধুদের মধ্যে বনভােজন নিয়ে আলাপ-আলােচনা চলছিল। অবশেষে আমরা সিদ্ধান্তে পৌছলাম যে, সােমবার সকাল ১০টায় নওগাঁর পাহাড়পুরে আমাদের সেই কাঙ্ক্ষিত বনভােজনের আয়ােজন করা হবে। তখনও সূর্যের মুখটি দেখা যায়নি। রংপুরের ঠাণ্ডা হাওয়ায় শরীর-মন কেঁপে উঠল । শহরের অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ । হয়তাে শীতের তীব্রতার জন্য এখানে একটু দেরিতে এগুলাে খােলা হয়। শহরের পাশ দিয়ে আর.কে. রােড হয়ে আমাদের বাসটি হেডলাইট জ্বালিয়ে চলেছে। রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা অত্যন্ত কম। গ্রামের মাঝ দিয়ে বড়াে রােড ধরে আমাদের গাড়িটি এগিয়ে যাচ্ছে। রাস্তার পাশে মাঝে মাঝে ছেলেদের দল আমাদের বাসের সামনে লাগানাে ব্যানারটিতে বড়াে অক্ষরে লেখা বনভােজন’ শব্দটি পড়ে যেন আনন্দ পাচ্ছিল। সকালে নাস্তার পর্বটি বাসের মধ্যেই আমরা সেরে ফেললাম। আমাদের ইংরেজির মানিক স্যার আমাদের আয়ােজনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। আমরা তাকে পেয়ে আনন্দে উদ্বেলিত। অবশেষে আমরা যখন পৌছলাম সূর্য তার মিষ্টি রােদ দিয়ে আমাদের আলিঙ্গন করল। আমরা উষ্ণ এক পরিবেশে পাহাড়পুরের পােড়ামাটির সুরকি লাগানাে নিদর্শনগুলাে প্রত্যক্ষ করতে লাগলাম। মানিক স্যার অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদের কখনাে বাংলায়, কখনাে ইংরেজিতে শত শত বছরের পুরনাে বৌদ্ধদের সে সুচারু কর্মকে বুঝিয়ে দিলেন। মনে মনে আমরা সবাই ভাবলাম এমন জায়গায় বনভােজনে না এলে আমাদের ষােলাে আনাই মাটি হতাে। যথারীতি যে যার ক্যামেরায় এবং মােবাইল ফোনে সেই ভােজনের ঐতিহাসিক ক্ষণটি ধারণ করল। বাংলাদেশে এরূপ হাজারাে স্থান রয়েছে যেগুলাে দর্শন না করলে জীবন অপূর্ণ থাকে। এবার একটু বিশ্রাম নিয়ে পাশের গ্রামে এক মুণ্ডা পাড়ায় বেড়াতে গেলাম। নৃ-গােষ্ঠীর প্রাচীন ধারাটি অনেকটা তাদের অতীত ঐতিহ্যকে বর্জন করে আধুনিক মানুষের মতাে পােশাক পরিধান করেছে। কিন্তু প্রবীণরা তাদের সেই পূর্বের ঐতিহ্যকে ধারণ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এবার ফেরার পালা, বাসে বসতেই মুরাদের মােবাইল ফোনে মধুর সুরে বেজে ওঠল রবি ঠাকুরের সেই সাড়া জাগানাে গানটি “ও আমার দেশের মাটি, তােমার পরে ঠেকাই মাথা। সত্যি আমাদের দেশ যে এত সমৃদ্ধ তা এই বনভােজনে না এলে তেমনভাবে উপলব্ধি করতে পারতাম না। বনভােজন যেমন মানুষের হৃদয়কে সতেজ ও সজীব করে তেমনি অজানা নানা কৌতূহল মেটায়।

Rate this post