ছিটমহল বিনিময় 

ছিটমহল বলতে বােঝায় একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় অবস্থিত অন্য কোনাে স্বাধীন রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত এলাকা বা অঞ্চল। অখণ্ড ভারত বিভক্ত করে ভারত এবং পাকিস্তান নামক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠালগ্নে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে রেডক্লিফের মানচিত্র বিভাজন থেকেই ছিটমহলের উদ্ভব ঘটে। এমন বিতর্কিত বিভাজনের ফলে এক দেশের ভূখণ্ডে থেকে যায় অন্য দেশের অংশ। এতে এক অসহনীয় মানবিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। ২০১৫ সালের ০১ আগস্টের পূর্ব পর্যন্ত ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের আর বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের সর্বমােট ১৬২টি ছিটমহল ছিল। এর মধ্যে ভারতের ১১১টি ছিটমহল ছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আর বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল ছিল ভারতের অভ্যন্তরে। এসব ছিটমহলে বসবাসকারী জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৫১ হাজার। ২৪ হাজার ২৬৮ একর ভূমি নিয়ে দুই দেশের ছিটমহলগুলাে অবস্থিত ছিল। ভারতীয় ছিটমহলগুলাের অধিকাংশই ছিল বাংলাদেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে। এসবের মধ্যে লালমনিরহাটে ৫৯টি, পঞ্চগড়ে ৩৬টি, কুড়িগ্রামে ১২টি ও নীলফামারিতে ৪টি ভারতীয় ছিটমহল ছিল। অপরদিকে বাংলাদেশের ছিটমহলগুলাের অবস্থান ছিল ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে। এর মধ্যে ৪৭টি কুচবিহার ও ৪টি জলপাইগুড়ি জেলায় অবস্থিত ছিল। কোনাে রকম সুবিবেচনা ছাড়াই হুট করে ভারত ও পাকিস্তানের সীমানা নির্ধারণের ফলে এ সমস্যার সৃষ্টি হয়। অভিযােগ রয়েছে, তঙ্কালীন কমিশন সদস্যদের নিষ্ক্রিয়তা আর জমিদার, নবাব, স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও চা। বাগানের মালিকেরা নিজেদের স্বার্থে দেশভাগের সীমারেখা নির্ধারণে প্রভাব ফেলেছে। তার ফলে উপমহাদেশের বিভক্তির পর বিগত ৬৮ বছর ধরে এক অমানবিক সমস্যা বয়ে বেড়িয়েছে দুই দেশ। ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে নেহেরু-নুন চুক্তি অনুযায়ী বেরুবাড়ীর উত্তর দিকের অর্ধেক অংশ ভারত এবং দক্ষিণ দিকের অর্ধেক অংশ ও এর সংলগ্ন এলাকা বাংলাদেশ পাবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। চুক্তি অনুযায়ী বেরুবাড়ির সীমানা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ভারতের অসহযােগিতায় তা মুখ থুবড়ে পড়ে। পরে ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে মুজিবইন্দিরা চুক্তির পর দুই দেশের ছিটমহলগুলাের আলাদাভাবে তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়। কিন্তু দুই পক্ষের তালিকায় গরমিল দেখা দেওয়ায় আবারও তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। অবশেষে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের ০১ আগস্ট রাত ১২:০১ মিনিটে দুই দেশ ঐতিহাসিক মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির আওতায় একে অন্যের অভ্যন্তরে থাকা নিজেদের ছিটমহলগুলাে পরস্পরের সাথে বিনিময় করে। এ ফলে দুই দেশের অর্ধলক্ষ মানুষ ৬৮ বছরের পরাধীন জীবন থেকে মুক্তি লাভ করে। অনিশ্চয়তার অন্ধকার থেকে তারা খুঁজে পায় আত্মপরিচিতির আলাের সন্ধান।

Rate this post