অনুন্নত শ্রেণি

অনুন্নত শ্রেণির অন্তর্গত সেইসকল মানুষ যারা অনগ্রসর, যাদের অগ্রগতির পথে বিভিন্ন বাধা তাদেরকে সমাজে পিছিয়ে রেখেছে। সংবিধানে ‘অনগ্রসর শ্রেণি’ শব্দটির ব্যাখ্যা না থাকলেও তপশিলি জাতি, তপশিলি উপজাতিদের এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই সকল মানুষজন সমাজের বিভিন্ন বাধা, কুসংস্কার রক্ষণশীল মনােভাব ধর্মের মানে বিভিন্ন কুপ্রথা ইত্যাদির প্রভাবে সমাজে অনেক পিছিয়ে। এদেরকে বলা হয় অনুন্নত শ্রেণি। ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে কাকাসাহেব কালেলকরের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে একটি কমিশন নিয়ােগ করা হয়। এই কমিশনের কাজগুলি হল— 

  • কীসের ভিত্তিতে অনগ্রসর বা অনুন্নত শ্রেণিকে চিহ্নিত করা হবে তা নির্ধারণ করা। 
  • এইসকল অনগ্রসর শ্রেণির একটি তালিকা তৈরি করতে হবে। 
  • অনুন্নত শ্রেণির মানুষের অসুবিধাগুলিকেনিরীক্ষণ করে তাদের জন্য কী কী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে সেগুলির সুপারিশ করা।

১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে কে কে কমিশন অনুন্নত শ্রেণিকে চিহ্নিত করেছে কতগুলি বিষয়ের উপর ভিত্তি করে। সেগুলি যথাক্রমে一

  • সমাজের নিম্নস্তরের মানুষজন।
  • শিক্ষাক্ষেত্রে যারা পিছিয়ে রয়েছে। 
  • সরকারি ক্ষেত্রে কোনাে বিশেষ শ্রেণির মানুষের স্বল্পসংখ্য নিয়োগ।
  • শিল্পবাণিজ্যে নিযুক্ত কমসংখ্যক কিছু মানুষ।

পরবর্তীকালে মণ্ডল কমিশন ৩৭৪৩ টি জাতি বা সম্প্রদায়কে  চিহ্নিত করেছে অনুন্নত জাতি বলে এই মণ্ডল কমিশন অনগ্রসর শ্রেণির জন্য ২৭ ভাগ আসন সংরক্ষণের কথা ঘােষণা করে।

ইউ এন দেবরের সভাপতিত্বে গঠিত কমিশনের সুপারিশসমূহ

ইউ এন ধেবর (Uchharangrai Navalshankar Dhebar) ছিলেন সৌরাষ্ট্র মুখ্যমন্ত্রী (১৯৪৮-১৯৫৪) এবং পরবর্তীকালে ১৯৫৫-১৯৫৯ এ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট পদ অলংকৃত করেন। শিক্ষাগত ক্ষেত্রে ভারতে তপশিলি উপজাতি (ST) ও তপশিলি জাতি (SC) ইত্যাদি শ্রেণির প্রতি বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়। তাই তাদের প্রাপ্য মর্যাদা, অধিকার যথাযথ শিক্ষার সুযােগ দান ইত্যাদির জন্য ইউ এন ধেবরের সভাপতিত্বে গড়ে ওঠে যে কমিটি তার সুপারিশ গুলি নিম্নলিখিত一

(১) মাতৃভাষায় শিক্ষা : এই সকল অনগ্রসর অনুন্নত জাতির জন্য বিদ্যালয়ে মাতৃভাষাকে মাধ্যম করে শিক্ষাদান করতে হবে।

(২) আশ্রম স্কুল: তপশিলি জাতি-উপজাতিদের জন্য আশ্রম স্কুল তৈরি করতে হবে। যেখানে শিক্ষকরা শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষাদান করবেন।

(৩) শিক্ষক নিয়ােগ: তপশিলি জাতি-উপজাতিদের জন্য বিদ্যালয়ে নিযুক্ত শিক্ষক-শিক্ষিকারা হবেন সেই সকল জাতি বা শ্রেণির অন্তর্গত।

(৪) ছাত্রাবাস: মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য ছাত্রাবাসের ব্যবস্থা করতে হবে।

(৫) ছাত্রবৃত্তি: তপশিলি জাতি ও উপজাতির শিক্ষার্থীদের জন্য ছাত্রবৃত্তির ব্যবস্থা করতে হবে, এমনকি তাদের পরিবারকেও আর্থিক অনুদান দিতে হবে যাতে সেই সকল পরিবারবর্গ উৎসাহিত হয়ে তাদের সন্তান সন্ততিদের পড়াতে পারে।

(৬) শিক্ষক প্রশিক্ষণ: যে সকল শিক্ষক-শিক্ষিকা নিযুক্ত হবেন তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ, ভাতা দেওয়া এমনকি আবাসনের ব্যবস্থাও করতে হবে যা বিদ্যালয় লাগােয়া হবে।

(৭) পাঠ্যপুস্তক: এই সকল অনগ্রসর শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের উপযােগী পাঠ্যপুস্তক রচনা করতে হবে, যা হবে তাদের জন্য সহজবােধ্য। মাতৃভাষায় এগুলি আলােচিত হবে।

(৮) বিশেষ Tution ব্যবস্থা: অনগ্রসর শিক্ষার্থীদের অগ্রগতির কথা মাথায় রেখে স্কুলের সময়ের বাইরেও তাদের জন্য বিশেষ Tution এর ব্যবস্থা থাকবে।

(৯) কর্মে নিয়ােগের ব্যবস্থা: ভবিষ্যৎ কর্মে নিয়ােগের জন্য এই সকল শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

(১০) স্কুল পরিবেশ: স্কুল পরিবেশ এমন হবে যা এই সকল শিক্ষার্থীদের উপযােগী পরিবেশ তৈরি করবে।

(১১) বেসরকারী উদ্যোগ: বেসরকারী সংস্থাগুলিকে উদ্যোগ নিয়ে আদিবাসী অধ্যুষিত অঞলে এগিয়ে আসতে হবে যাতে সেইসকল অঞলের মানুষ কাজের সুযােগ পায়।

(১২) প্রতিভাবন শিক্ষার্থী: প্রতিভাবন শিক্ষার্থীরা যারা তপশিলি জাতি ও উপজাতির অন্তর্গত তাদেরকে এই সকল স্কুলগুলিতে  শিক্ষকতার সুযােগ দিতে হবে।

এইভাবে অনুন্নত সম্প্রদায়ের উন্নতির ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে তারা সামাজিক, অর্থনৈতিক সব বাধা পেরিয়ে সমসুযােগ ও প্রাপ্য মর্যাদা পায়।

Rate this post