১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে আগস্ট মাসে শিক্ষা বিষয়ক সম্মেলন প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী নতুন শিক্ষানীতি প্রসঙ্গে বলেছেন “The world is progressing tremendously rapidly. The only thing that can keep India abreast of this progress is a solid grounding in education for all our people.”এর পরই প্রকাশিত হয়েছিলো ‘Challenge of Education : A Policy Perspective’. শিক্ষার নামকরণ হল Human Resource Development অর্থাৎ মানবসম্পদ উন্নয়ন। বইটির মধ্যে ছিল অতীতের তথ্যভিত্তিক ত্রুটিবিচ্যুতি-সহ নানা প্রস্তাব। আর ছিল শিক্ষাসুযােগের সমতাবিধান, সামাজিক ন্যায়বিচার, উন্নয়নের সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্ক এরূপ বিবিধ  বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি। অবশেষে জাতীয় স্তরে বহু তর্কবিতর্কের পর ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে জাতীয় শিক্ষানীতি (১৯৮৬ খ্রিঃ.)-এর প্রকাশ ঘটে।

শিক্ষা কমিশন (১৯৬৪-৬৬ খ্রি.) কতকগুলি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপর ভিত্তি করে জাতীয় শিক্ষানীতি (১৯৮৬ খ্রিঃ.)-এর পরিকাঠামো রচিত হয়েছে। নতুন এই শিক্ষানীতি পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কতগুলো নতুন সমস্যা অথবা অতীতের অবহেলিত সমস্যাগুলির উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষা, নারীশিক্ষা, সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা, প্রথামুক্ত শিক্ষা, বয়স্ক শিক্ষা, কর্মকেন্দ্রিক শিক্ষা ইত্যাদি অত্যাধুনিক প্রয়োজন ভিত্তিক শিক্ষার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। তথাপি এই শিক্ষানীতিতে বিজ্ঞান- কারিগরি, প্রযুক্তি, ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি বেশ কিছু ক্ষেত্রে ত্রুটি সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। ত্রূটিগুলো নিম্নরূপ –

(১) নতুনত্বের অভাব: কেন্দ্রীয় সরকার যে নতুন শিক্ষানীতি গ্রহণ করে, তার মধ্যে নতুন কিছু নেই। বিভিন্ন শিক্ষা কমিশন ও শিক্ষা কমিটি বিশেষত কোঠারি কমিশন (১৯৬৪-৬৬ খ্রি.) ও জাতীয় শিক্ষানীতির (১৯৬৮ খ্রিঃ.)-এর দ্বারা প্রভাবিত। জাতীয় সংহতি, ধর্ম নিরপেক্ষতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবােধ, সামাজিক ন্যায় প্রভৃতি আদর্শের কথা বারবার বলা হয়েছে। যদিও এই গুণগুলি আদৌ মানুষের মনে কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা বোঝা অসম্ভব।

(২) সুপারিশ কার্যকরণের অভাব : কোঠারি কমিশন যেসব মূল্যবান সুপারিশ করেছিল, সেগুলো বাস্তবে কার্যকর করার প্রচেষ্টা নতুন শিক্ষানীতির দেখা যায়নি। ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় শিক্ষানীতিতে সর্বজনীন শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। নিম্নমাধ্যমিক স্তর থেকেই বৃত্তি ও কারিগরি শিক্ষার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দ পার হয়ে যাওয়ার পরও তা সফল হয়নি।

(৩) সুপারিশ কার্যকরণের শ্লথগতি : ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় শিক্ষানীতিতে শিশু ও নারী শিক্ষা, সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা, প্রথাবর্জিত শিক্ষা, সামাজিক শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উন্নতি বিষয়ক শিক্ষা ইত্যাদির প্রতি বিশেষ নজর দেওয়ার কথা বলা হয়। বর্তমান কাল পর্যন্তও এগুলো রূপায়ণের কাজ চলে আসছে শ্লথগতি।

(৪) অর্থ সংস্থান : নতুন শিক্ষানীতিতে বলা হয়েছিল, ১৪ বছরের মধ্যে সকল ছেলে মেয়ের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থা করা আবশ্যিক। কিন্তু এর জন্য যে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন তার সংস্থান কীভাবে হবে, সে সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। DropOut বা স্কুলছুট শিক্ষার্থীদের সমস্যার সমাধান কীভাবে সম্ভব সে সম্পর্কে কিছু মন্তব্য করা হয়নি।

(৫) বিদ্যালয়ছুটদের সমস্যাসমাধানে ব্যর্থতা : ভারতীয়দের মধ্যে শিক্ষার প্রসারের ক্ষেত্রে একটি বিরাট বাধা হল বিদ্যালয় ছুট (Dropout) শিক্ষার্থী। এই সমস্যা সমাধানের কথা ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় শিক্ষানীতিতে নেই। যদিও ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় শিক্ষানীতিতে প্ৰথাবর্জিত শিক্ষা, দূরশিক্ষার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তবে বিদ্যালয় ছুটির সংখ্যা ন্যূনতম পর্যায়ে নিয়ে আসা যায়।

(৬) কারিগরি শিক্ষায় পরিকল্পনার অভাব : NPE-1986, যথাযথভাবে কার্যকরী হলে এতদিনে ৫০% শিক্ষার্থী কারিগরি শিক্ষায় পারদর্শী হয়ে উঠত। এখন নতুন শিক্ষানীতি ১৯৮৬-তে বলা হয়েছে, ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ২৫% শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু কীভাবে করা হবে তা ব্যাখ্যা করা হয়নি।

(৭) বৃত্তিশিক্ষার আশানুরূপ প্রসারে ব্যর্থতা : বৃত্তিশিক্ষার বিষয়টি কার্যকর করার জন্য প্রতিটি রাজ্যে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বহু কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলো তার কাজ প্রত্যাশামতো হয়নি। এ ছাড়া বৃত্তিশিক্ষার প্রসারও আশানুরূপ ঘটেনি।

(৮) নবোদয় বিদ্যালয়ের পরিকল্পনার অভাব : NPE-1986-তে মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য মডেল স্কুল বা ‘নবোদয় বিদ্যালয়’-এর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু অনেকের মতে, এর ফলে সমাজে জাতিবৈষম্য জন্ম নেবে। অর্থাৎ এই বিদ্যালয় জাতিভেদ সৃষ্টি করবে। তা ছাড়া এই বিদ্যালয় চালাতে গেলে যে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়ােজন, তা সরকার বহন করবে কি না, সন্দেহ আছে। বর্তমানে তাই এই বিদ্যালয়ের সংখ্যা অনেক কম।

(৯) নবোদয় বিদ্যালয়ের ভিত্তিহীন : গ্রামের প্রতিভাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য নবোদয় বিদ্যালয়-এর কথা ভাবা হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে তা কতটা সম্ভব হয়েছে তা অনিশ্চিত। তা ছাড়া এই বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানোর ব্যবস্থা ছিল। ফলে এই বিদ্যালয়কে অনেকে ‘গােড়াকাটা বৃক্ষের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই বিদ্যালয়ে পড়লে জাতীয় শিক্ষাধারার মূল প্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল বলে বহু শিক্ষাবিদ মনে করেন।

(১০) অপ্রতুল মডেল স্কুল : এই শিক্ষানীতিতে মডেল স্কুল প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল, তা সত্ত্বেও মডেল স্কুলের সংখ্যা সমস্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যার তুলনায় অনেক কম ছিল।

(১১) চাকরি থেকে ডিগ্রি বিচ্ছিন্ন করার : নতুন শিক্ষানীতিতে চাকরি থেকে ডিগ্রি কে বিচ্ছিন্ন করার কথা বলা হয়েছে। রাধাকৃষ্ণন কমিশনেও এই সুপারিশ করা হয়েছিল। যদি এটি সম্ভব হত, তাহলে শিক্ষাকে পরীক্ষা কেন্দ্রিকতা থেকে রক্ষা করা যেত, কিন্তু বর্তমানে তা সম্ভব হয়নি। চাকরিতে নিয়োগকারীরা যদি তাদের নিজস্ব পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন তাহলে এটি সম্ভব। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা ডিগ্রি নির্ভর হয়ে পড়ছে।

(১২) স্বশাসিত কলেজ পরিচালনার অভাব : স্বশাসিত কলেজ পরিচালনার জন্য যে সততা, নিষ্ঠা, নিরপেক্ষতা ও কঠোর শৃঙ্খলার প্রয়োজন, তা আমাদের কলেজগুলিতে অবর্তমানে।

(১৩) অন্যান্য ত্রূটিসমূহ : অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের উপর গুরুত্ব দিয়ে বহিঃপরীক্ষার মান হ্রাস। বিশেষ বিশেষ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসনের অধিকার দিয়ে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্য সৃষ্টি। হিন্দি ও ইংরেজির উপর মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে ভারতীয় অন্যান্য ভাষাকে অবহেলা ইঙ্গিত প্রদান। নিরক্ষরতা সৃষ্টির উৎসমুখ যুদ্ধ না করে নিরক্ষরতাকে বাঁচিয়ে রাখার ইঙ্গিত প্রদান। মডেল স্কুল গুলোর জন্য কেন্দ্রের অঢেল অর্থ ব্যয়।

সবশেষে বলা যায়, NPE-1986 নিয়ে যেমন সমালােচনার দিক আছে, তেমনি এতে অনেক ভালো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। সে-সমস্ত ভালাে দিকগুলিকে যতটা সম্ভব কার্যকরী করে, খারাপ অংশগুলো পুনর্গঠন করে বাস্তবে প্রয়োগ করা দরকার।

Rate this post