আমাদের দেশে মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত ও পরিমাণগত উন্নতি ঘটলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। এ রকম সমস্যার কারণ গুলি নিম্নে আলোচনা করা হল— 

(১) বিদ্যালয়ের অভাব: আমাদের দেশে প্রতি বছর মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী যেভাবে বেড়ে চলেছে, সেই অনুযায়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই বর্তমানে বিদ্যালয়ের অভাব এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

(২) দূরত্ব : বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীদের বাসস্থানের দূরত্বজনিত কারণ, মাধ্যমিক শিক্ষার পথে অন্যতম সমস্যা।

(৩) পিতা-মাতার অনীহা : অনেকাংশে অভিভাবক-অভিভাবিকা গণের উদাসীনতা মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণত গ্রামাঞ্চলের, কিছু মানুষ, (দরিদ্র শ্রেণিভুক্ত) অনুন্নত জাতি বা সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষ আজও কন্যাসন্তানের পড়াশোনার ব্যাপারে তীব্র অনীহা প্রকাশ করেন। তা ছাড়া যেসকল পিতা-মাতা নিরক্ষর বা পড়াশােনা জানেন না, তারা তাদের সন্তানদের শিক্ষার প্রতি অত্যন্ত নিরুৎসাহী।

(৪) আর্থিক প্রতিকূলতা : যে সকল পরিবারের আর্থিক প্রতিকূলতা বর্তমান, সকল পিতা-মাতারা স্বাভাবিকভাবেই তাদের সন্তানদের পড়াশোনার ব্যাপারে উদাসীন।

(৫) সংকীর্ণ তাত্ত্বিক ও পুথিনির্ভর শিক্ষা : মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠক্রম সংকীর্ণ তাত্ত্বিক ও পুথিনির্ভর। যা বাস্তব জীবনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের জীবনের সঙ্গে তা সম্পর্কহীন ও একঘেয়ে। এই শিক্ষা শিক্ষার্থীর কর্মজীবনেও সবসময় সাহায্য করতে পারে না।

(৬) বৈচিত্র্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থা : শিক্ষা ব্যবস্থার বৈচিত্র্যহীনতার, মাধ্যমিক শিক্ষার অন্যতম সমস্যা।

(৭) সহপাঠক্রমিক কার্যাবলির অবহেলা : মাধ্যমিক শিক্ষায় সহপাঠক্রমিক কার্যাবলীকে ঐচ্ছিক বিষয় করার জন্য বিষয়টি অনেক ছাত্র ছাত্রী গ্রহণ করে না, ফলে শিক্ষার্থীর সার্বিক বিকাশের দিকটি অনেকাংশেই ব্যাহত হয়।

(৮) বৃত্তি শিক্ষার সুযোগের অভাব : আমাদের দেশের মাধ্যমিক শিক্ষা বিদ্যালয়গুলিতে বৃত্তিশিক্ষার সেরকম ব্যবস্থা নেই। কিন্তু পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলোতে বৃত্তিশিক্ষার মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় করা হয়েছে। তাই আমাদের দেশের মাধ্যমিক শিক্ষায় এটা একটা বড় সমস্যা।

(৯) উপযুক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকার অভাব : উপযুক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকার অভাব, বর্তমানে মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি অন্যতম প্রধান বাধা।

(১০) পাঠক্রমের ত্রূটি : মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠক্রম তাত্ত্বিক হওয়ায় শিক্ষার্থীরা আকর্ষণের অভাব বোধ করে। পাঠক্রমের ত্রূটি মাধ্যমিক শিক্ষাই বড় বাধা।

(১১) পাঠ্যপুস্তকের সমস্যা : ভারতীয় জনগণের অধিকাংশই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। গরিব মানুষেরা অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় বই কিনতে পারে না। তাই পাঠ্যপুস্তকের অভাব এই শিক্ষার অন্যতম সমস্যা।

(১২) মূল্যায়ন পদ্ধতির ত্রূটি : আমাদের দেশে মূল্যায়ন পদ্ধতির বেশিরভাগটাই পরীক্ষার উপর নির্ভরশীল। শিক্ষার্থীর বৌদ্ধিক বিকাশের উপর জোর দেওয়া হয়। অন্যান্য দিকের পরিমাপ করা হয় না। এই পরীক্ষা ব্যবস্থার ত্রূটি আছে যা মূল্যায়ন পদ্ধতিকেও কি ত্রুটি যুক্ত করেছে।

(১৩) ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত সমস্যা  : গ্রামাঞ্চলে বিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র শিক্ষকের অনুপাতের সমস্যা প্রবল। একজন শিক্ষক অনুপাতে ১০০ বা তার অধিক ছাত্র (১:১০০/১২০) প্রতি ক্লাসে আছে। ফলে পঠনপাঠন ব্যাহত হচ্ছে।

(১৪) অপচয় ও অনুন্নয়ন : প্রাথমিক শিক্ষার মতাে প্রবল না হলেও মাধ্যমিক শিক্ষায় অপচয় ও অনুন্নয়ন একটি বড় সমস্যা। এই শিক্ষার স্তরেও বহু শিক্ষার্থী মাঝপথে পড়া ছেড়ে দেয়।

(১৫) নিয়মিত পরিদর্শন হয় না : মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলিতে নিয়মিত পরিদর্শন হয় না। পরিদর্শন অভাবে বিদ্যালয় গুলো ঠিকমতো নিয়ম মেনে কাজ করে না। এর ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যাহত হয়।

(১৬) অমনোবৈজ্ঞানিক শিক্ষণ পদ্ধতি : মাধ্যমিক শিক্ষার শিক্ষণ পদ্ধতি অমনোবৈজ্ঞানিক ও একঘেয়ে। অধিকাংশ বিদ্যালয় উপযুক্ত পরীক্ষাগার, গ্রন্থাগার ও শিক্ষা উপকরণের অভাব মাধ্যমিক শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা।

 

উপরোক্ত কারণগুলো মাধ্যমিক শিক্ষার বিশেষ সমস্যাগুলো মাধ্যমিক শিক্ষার প্রসারে আজও বাধা সৃষ্টি করে। এই সমস্ত সমস্যাগুলোকে কাটিয়ে উঠতে পারলে, মাধ্যমিক শিক্ষার সমস্যাগুলি অনেকাংশে লাঘব হতে পারে।

Rate this post