সবার জন্য স্বাস্থ্য

[ সংকেত: ভূমিকা; স্বাস্থ্য; স্বাস্থ্যের গুরুত্ব; স্বাস্থ্যের প্রয়ােজনীয়তা; বাংলাদেশি নাগরিকদের স্বাস্থ্য; বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা; জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে সরকারি পদক্ষেপ; জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে বেসরকারি কর্মসচি; সবার জন্য স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা; উপসংহার। ]

ভূমিকা : ‘ স্বাস্থ্যই সম্পদ ‘– কথাটি সকল শ্রেণি-পেশা, জাত-ধর্ম নির্বিশেষে সব মানুষের জন্য প্রযোজ্য। স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল, স্বাস্থ্য ভালাে তাে মন ভালাে। তাই আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে জনপ্রিয় একটি স্লোগান হলাে সবার জন্য স্বাস্থ্য’। সুখী জীবনযাপনের জন্য চাই সুস্বাস্থ্য। আর সুস্বাস্থ্য মানেই হলাে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা। সমন্বিতভাবে শারীরিক ও মানসিক উভয় দিকেই সুস্থতা বিরাজ করলে একজন ব্যক্তিকে সুস্থ বলা যায়। বিশ্বের প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার ও মৌলিক দাবি এ সুস্থতা অর্জন করা। সম্প্রতি বাংলাদেশে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং এর প্রতিফলনও ঘটেছে। সবার জন্য স্বাস্থ্য’– এ গেটি stusta Dr. Zafrullah Chowdhury oto ‘Politics of Drugs’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘Health for all is a global slogan, which deserves successful materialization.’ অর্থাৎ সবার জন্য স্বাস্থ্য একটি বৈশ্বিক স্লোগান, যা সার্থকভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। 

স্বাস্থ্য : স্বাস্থ্য বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা WHO-তে স্বাস্থ্যের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘Health is the state of physical and mental soundness as well as spiritual and social well-being, not absence of mere diseases.’ অর্থাৎ স্বাস্থ্য শুধু রোগের অনুপস্থিতি নয় বরং দৈহিক, মানসিক, আত্মিক ও সামাজিক পূর্ণাঙ্গতা। স্বাস্থ্য বলতে বুঝি, শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে সম্পূর্ণ কর্মক্ষম অবস্থা। তাছাড়া অন্যভাবে বলা যায়, স্বাস্থ্য হলাে কোনাে প্রকার রোগ না থাকা, কোনাে রকম অস্বস্তিবােধ না করা এমন সব সময় সুখ অনুভব করা। 

স্বাস্থ্যের গুরুত্ব : মানবজীবনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলাে স্বাস্থ্য। কোনাে কোনাে মনােবিজ্ঞানী বলেছেন, স্বাস্থ্যই সুখের মূল। জাপানিরা স্বাস্থ্য সম্পর্কে বলে থাকে- ‘Man sanain corepore sako.’- অর্থাৎ সুস্থ দেহে সুস্থ মন। সুতরাং বলা যায়, শরীর ভালাে থাকলে মন ভালাে থাকে। অতএব শরীর সুস্থ থাকার নামই স্বাস্থ্য। স্বাস্থ্য ভালাে না থাকলে কোনাে কাজ ভালো লাগে না। কোনাে কিছুতে শান্তি পাওয়া যায় না, কোনাে কাজ করার ইচ্ছা জাগে না। সামান্য বিপর্যয়ে হতাশ হয়ে পড়ে। সবকিছুতেই অস্বস্তিবােধ হয়। সুতরাং মানব জীবনে স্বাস্থ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। এ বিষয়ে মহানবি হজরত মুহাম্মদ (স)-এর বাণী一

স্বাস্থ্যের চেয়ে বড়াে সম্পদ আর অল্পে তুষ্টির চেয়ে বড়াে কিছুই নেই। 

স্বাস্থ্যের প্রয়ােজনীয়তা : ‘A healthy man is a happy man.’ অর্থাৎ একজন স্বাস্থ্যবান মানুষই একজন সুখী মানুষ। সুস্বাস্থ্য ছাড়া সুখী হওয়া যায় না। তাই মানুষকে সুখী হতে হলে সবার আগে সুস্বাস্থ্যের প্রয়ােজন। স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে কাজকর্ম, খাওয়াদাওয়া, ঘুম কোনাে কিছুই ভালাে লাগে না। স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক কোনাে দায়িত্বই যথার্থভাবে পালন করা সম্ভব হয় না। স্বাস্থ্যহীন ব্যক্তি ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সার প্রাচুর্যের মধ্যেও সুখী হতে পারে না। আনন্দ-উজ্জ্বল সুখময় | জীবনের জন্য সুস্বাস্থ্যের কোনাে বিকল্প নেই। শরীর সুস্থ থাকলে মনে আনন্দ থাকে, কর্মস্পৃহা বাড়ে। শরীর অসুস্থ থাকলে কাজে অলসতা ও স্থবিরতা আসে। তাই বলা যায়, স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল’ বা ‘Health is wealth.’ সুতরাং মানব জীবনে স্বাস্থ্যের প্রয়ােজনীয়তা অপরিসীম।

বাংলাদেশি নাগরিকদের স্বাস্থ্য : বাংলাদেশের নাগরিকদের স্বাস্থ্যের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। বাংলাদেশ সরকার ২০০০ সালের মধ্যে সবার জন্য স্বাস্থ্য কর্মসূচিটি বাস্তবায়নের ঘােষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু এ ঘােষণা আজও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষই দারিদ্র্যের সাথে লড়াই কর বেঁচে আছে। তারা অর্থের অভাবে উপযুক্ত শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান কোনাে কিছুই পাচ্ছে না। তাছাড়া রাজনীতিক অস্থিরতার কারণে রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি সময় মতাে এগােতে পারছে না। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দেশের উন্নতি সকল ক্ষেত্রেই পদে পদে বাধা আসছে। তাছাড়া আর্থনীতিক ও গণসচেতনতার অভাবে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য কর্মসূচি কাক্ষিত লক্ষ্যে পৌছাতে পারেনি। বাংলাদেশে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য কর্মসূচি সফল না হওয়ার আরও কয়েকটি কারণ রয়েছে। তা হলাে- কুসংস্কার, শিক্ষার অভাব, অস্বাস্থ্যকর বাসস্থান, পরিবেশ দূষণ, ওষুধের উচ্চমূল্য, স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব, পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও চিকিৎসার অভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি। 

বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা : বাংলাদেশ সরকার ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য কর্মসূচি ঘােষণা করেছেন। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্বাস্থ্যখাতে সরকারিভাবে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে সেগুলাে পর্যাপ্ত নয়। আমাদের দেশে জনসংখ্যা অধিক। জনসংখ্যার তুলনায় দেশে হাসপাতালের সংখ্যা সীমিত। তাছাড়া আমাদের দেশের অধিকাংশ হাসপাতালের অবস্থা এতই নােংরা যে, সুস্থ মানুষ। হাসপাতালে কিছুক্ষণ অবস্থান করলে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। উন্নত যন্ত্রপাতি ও অভিজ্ঞ ডাক্তারের অভাবে রােগীরা পর্যাপ্ত ও সঠিক চিকিৎসা পাচ্ছে না। তাছাড়া বেসরকারি হাসপাতালে লাগামহীন খরচের অভাবে দরিদ্র মানুষ চিকিৎসা নিতে পারছে না। এসব প্রতিকূল পরিবেশের কারণে সবার জন্য স্বাস্থ্য কর্মসূচি আজও বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সবার জন্য স্বাস্থ্য কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে ও কাজ চালিয়ে যেতে হবে এবং জনগণকে স্বাস্থ্য সচেতন হতে হবে।

জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে সরকারি পদক্ষেপ : শিক্ষার অভাবে বাংলাদেশের জনগণ আজও স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে ওঠেনি। বাংলাদেশে সবার জন্য স্বাস্থ্য কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য সরকার বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে উল্লেখযােগ্য প্রকল্প হলাে- টিকাদান কর্মসূচি। এ প্রকল্পের আওতায় ১৯৭৯ সালে ৯টি টিকা বিনামূল্যে দেওয়া হয়। এতে শিশুদের রােগ প্রতিরােধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে শিশুরা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে উঠছে। এই টিকাদান কার্যক্রমের ফলে যক্ষ্মা, হাম, পােলিও, বসন্তের মতাে মারাত্মক রােগ প্রায় নির্মূল হয়েছে। এতে শিশু মৃত্যুর হার যেমন কমেছে তেমনি শিশুদের রাতকানা, বেরিবেরি, অপুষ্টিজনিত রােগও কমেছে। মায়েদের স্বাস্থ্য সচেতন করার জন্যও সরকার বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছেন। তাছাড়া প্রতি জেলা, থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্য সেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরকারের গৃহীত পদক্ষেপকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সরকারি কর্মচারী ও সকল স্তরের জনগণকে সচেতন হতে হবে। তাহলে সবার জন্য স্বাস্থ্য কর্মসূচি সফল হবে। জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে বেসরকারি কর্মসূচি : ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারি পদক্ষেপের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। ব্র্যাক, আশা, গণস্বাস্থ্য, প্রশিকা, সবুজ ছাতাসহ অনেকগুলাে সংস্থা গ্রামের লােকদের স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্য সচেতন করতে বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ করছে। তাছাড়া বাংলাদেশে স্বাস্থ্য সচেতনতার জন্য আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা নানা কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে সবার জন্য স্বাস্থ্য কর্মসূচি বাস্তবায়ন সম্ভব। 

সবার জন্য স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা : বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। সকল ক্ষেত্রে এদেশের জনগণ এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অবনতি দেখা যায় অর্থ ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে। আর্থিক সমস্যার কারণে বাংলাদেশের মানুষ স্বাস্থ্যগত সমস্যাসহ আরও নানা সমস্যায় ভুগছে। এ ধরনের সমস্যা থেকে মুক্তির জন্য চাই মানসিক প্রশান্তি, আত্মিক বিকাশ, দৈহিক সুস্থতা ও সামাজিক পরিবেশ। এসব বিষয়ে মানুষকে সহায়তা করার জন্য বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে Community based medical college. এ প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য হলাে সবার জন্য স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা। তাছাড়া বাংলাদেশের মানুষকে স্বাস্থ্য সচেতন করার জন্য মেডিকেল সিলেবাসে সংযােজন করা হয়েছে, ‘Comunity medical’ নামক একটি পত্র। 

উপসংহার : স্বাস্থ্যই মানবজীবনে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে স্বাস্থ্য অন্যতম। তাই প্রত্যেককে নিজের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সবার জন্য স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে সচেতন হতে হবে। আর এজন্য সরকারসহ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। কেননা সুস্থ না থাকলে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উন্নতিতে কার্যকর কোনাে ভূমিকা রাখা সম্ভব হয় না। তাই সবার জন্য স্বাস্থ্য রক্ষায় সরকারসহ জনগণকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

Rate this post