বাংলাদেশের মৎস্য সম্পদ
অথবা, বাংলাদেশের আর্থনীতিক উন্নয়নে মৎস্য সম্পদ

[ সংকেত: ভূমিকা; মাছের উৎস; মাছের প্রকারভেদ; খাদ্য হিসেবে মাছ; জীবিকা নির্বাহে মাছ; বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে মাছ; মৎস্য । সম্পদ বিলুপ্তির কারণ; মৎস্য সম্পদ রক্ষার উপায়; মৎস্য সম্পদ রক্ষায় সরকারি উদ্যোগ; উপসংহার। ]

ভূমিকা : মাছে ভাতে বাঙালি— এটি বাংলাদেশে প্রচলিত একটি প্রাচীন প্রবাদ। নদীমাতৃক বাংলাদেশের মানুষের প্রিয় খাদ্য মাছ। আমাদের দেশের নদী-নালায়, খালে-বিলে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। তাছাড়া নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর, সমুদ্র-উপকুল, জলাশয় মাছ চাষের জন্য উপযােগা। গরিবের আমিষ বলে খ্যাত মাছ চাষে আমাদের জাতীয় অর্থনীতির চাকা সচল থাকবে। তবে বাংলাদেশে ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও মৎস্য চাষের জন্য তেমন কোনাে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি। আমাদের বাংলাদেশে বিভিন্ন মৌসুমে বিভিন্ন প্রকারের মাছ পাওয়া যায়। মাছ চাষ করে আমাদের প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের সুযােগ রয়েছে। 

মাছের উৎস : নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর, হাওড়, জলাশয় ইত্যাদি মাছের প্রধান উৎস। নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদী-নালা, খালবিল, পুকুর, হাওড় ও জলাশয়ে ছেয়ে আছে, যা মিঠা পানির মাছ চাষের উপযােগী। আর এ জলাশয়ের আনুমানিক পরিমাণ প্রায় ৭,২৪০ কিলােমিটার দীর্ঘ নদী, প্রায় ছয় লক্ষ পুকুর, অসংখ্য খাল-বিল ও হাওড়। তাছাড়া আমাদের জন্য অগভীর সাগর জলে সামুদ্রিক মাছ শিকারের সুবিধা রয়েছে। প্রধান মৎস্যচারণ কেন্দ্র হিসেবে উপযােগী জায়গা হলাে : কুতুবদিয়া, সােনাদিয়া, সেন্টমার্টিন দ্বীপ, দুবলার চর, কক্সবাজার, রাঙাবালি ও বাইশদিয়া। অভ্যন্তরীণ মৎস্য কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় খেপুপাড়া, গােয়ালন্দ, আশুগঞ্জ ও ভৈরব। তাছাড়া উন্নত মানের মৎস্য পােতাশ্রয় নির্মাণ করা হচ্ছে চট্টগ্রাম ও চালনায় ।

মাছের প্রকারভেদ : মৎস্য প্রধান এই দেশে দুই ধরনের মাছ পাওয়া যায়। যথা- মিঠা পানি বা স্বাদু পানির মাছ এবং নােনা পানির মাছ। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মাছই মিঠা পানির মাছ। মিঠা পানির বড়াে মাছের মধ্যে যে মাছগুলাে রয়েছে তা হলাে : রুই, কাতলা, পাঙ্গাশ, বােয়াল, চিতল, মৃগেল, শােল, আইড়, গজার, বাঘাইর, কোরাল, গলদা ও বাগদা চিংড়ি প্রভৃতি। আর ছােটো মাছের মধ্যে রয়েছে- সরপুঁটি, কৈ, গুজি, পুঁটি, বাইন, চান্দা, তিতপুঁটি, ফলই, গােলসা বউ, চেলা, বেলে, ফলি, পাবদা, শিং, মাগুর, চেলা, মলা, ঢেলা, ট্যাংরা, লটকা, মাওয়া, খােকশা, গুইজা, কালাবাটা, ঘাউরা, খলশে, রয়না ইত্যাদি। খাল-বিল, হাওড়ে প্রচুর পরিমাণে কৈ, পুঁটি, শিং, মাগুর, চেলা, মলা, ঢেলা, পাবদা, শােল, টাকি ইত্যাদি মাছ পাওয়া যায়। নােনা পানিতে বিভিন্ন প্রকার মাছ পাওয়া যায়। যেমন- ইলিশ, ছুরি, লাটিয়া, লাক্ষা, রূপচান্দা ইত্যাদি। নােনা পানির মাছের মধ্যে প্রধান মাছ ইলিশ। ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। এ মাছ যেমন সুস্বাদু তেমনি পুষ্টিকর। 

খাদ্য হিসেবে মাছ : বাঙালির প্রিয় খাদ্যের তালিকায় মাছ অন্যতম । মাছ প্রাণিজ আমিষের অন্যতম উৎস। পুষ্টিকর এ খাদ্য মুখরােচকও বটে। মাছ খেতে সাধারণত কারও অরুচি হয় না। ধনী-গরিব, ছােটো-বড়াে সকলেই মাছ খেতে ভালােবাসে। প্রােটিন সমৃদ্ধ খাদ্যটি সকলের উপকারে আসে। প্রতিদিনের খাদ্যে প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ আমিষ আসে মাছ থেকে। এতে যেমন | আমাদের পুষ্টির ঘাটতি পূরণ হয়, তেমনি নানা প্রকার রােগ-ব্যাধি থেকেও মুক্ত রাখে।

জীবিকা নির্বাহে মাছ : বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে অনেক মানুষ মৎস্যজীবী পেশার সাথে জড়িত, যাদের জীবিকা নির্বাহের প্রধান উপায় মাছ। প্রাচীনকাল থেকেই মাছ শিকার ও মাছ চাষের প্রচলন শুরু হয়, যা এখনও মানুষ জীবিকা নির্বাহের পেশা হিসেবে ধরে রেখেছে। বাংলাদেশে মােট জনসংখ্যার প্রায় ১০ ভাগই প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষভাবে মৎসজীবী। এরা কেউ মাছের ব্যবসায় করে, কেউবা মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করছে। মাছ ধরার বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। একেক জন একেক পদ্ধতিতে মাছ ধরে। ট্রলার চালিয়ে সমুদ্র থেকে মৎস্যজীবীরা সামুদ্রিক মাছ ধরে। যা দেশি ও বিদেশি বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। গ্রামের নদী-নালা, খাল-বিল থেকে ছােটো-বড়াে নানা প্রজাতির মাছ শিকার করে দরিদ্র শ্রেণির মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছে। মাছের ব্যবসায় করে অনেকে ভালােভাবে জীবনযাপন করছে। সরকারি উদ্যোগে মৎস্যজীবীদের মধ্যে সমবায় সমিতি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। 

বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে মাছ : বর্তমানে রপ্তানিতে মাছ দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে। দেশে রপ্তানি খাতে পােশাক | শিল্পের পরই মাছের স্থান। বাংলাদেশ প্রতি বছর বিভিন্ন প্রকার মাছ রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে চিংড়ি ও ইলিশ রপ্তানির ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। আমাদের জাতীয় আয়ের শতকরা ৫ ভাগ অর্জিত হয় মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৪০০ (চার শত) কোটি টাকা আয় হচ্ছে মাছ রপ্তানি করে। দিন দিন এ খাত থেকে আয়ের পরিমাণ বাড়ছে। মৎস্য চাষের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে আমাদের দেশে। কেননা বৈদেশিক বাজারে বাংলাদেশের ইলিশ, শটকি ও গলদা চিংড়ির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশের সমুদ্রোপকূলে বিরাট অংশ জুড়ে চিংড়ি চাষের উপযােগী জায়গা রয়েছে। এসব জায়গায় চিংড়ি চাষ করে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ প্রচুর লাভবান হচ্ছে। সুতরাং বলা যায়, মৎস্য চাষ করে বৈদেশিক মদা অর্জন এবং জাতীয় আয় বৃদ্ধি করা সম্ভব। 

মৎস্য সম্পদ বিলুপ্তির কারণ : বৈচিত্র্যময় জলজ পরিবেশে গড়া বাংলাদেশ একসময় মৎস্য ভান্ডারে পরিণত ছিল। বর্তমানে বিভিন্ন কারণে আমাদের দেশের মাছ প্রায় বিলুপ্তির পথে। বিশেষ করে মুক্ত জলাশয়ের মাছ ব্যাপক হারে হ্রাস পাচ্ছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে পানির অভাব । ভারত গঙ্গার ওপর বাঁধ নির্মাণ করেছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে আমাদের দেশের নদী-নালা, খাল-বিল শুকিয়ে যায়। এতে মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ও বিচরণক্ষেত্র ধ্বংস হচেছ । আমাদের দেশে জনসংখ্যা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাই খাল-বিল, পুকুর-ডােবা ভরাট করে ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট নির্মাণ করছে। ফলে মৎস্যক্ষেত্র কমছে। এতে মাছ বংশবৃদ্ধি করতে পারছে না এবং খাদ্যের উৎসস্থল ক্রমাগত সংকুচিত ও দূষিত হয়ে পড়ছে। তাছাড়া কৃষিজমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাছের এতক খাদ্য ধ্বংস হচ্ছে। ইতােমধ্যে ১২০ প্রজাতির মাছের বিলুপ্তি হয়েছে এবং আরও অনেক প্রজাতির মাছ প্রায় বিলুপ্তির পথে। এর সঙ্গে আবার যুক্ত হয়েছে পােনা, ডিমওয়ালা মাছ, জাটকাসহ সকল প্রকারের মাছ নির্বিচারে নিধন করার প্রবণতা। ফলে, মৎস্য সম্পদ ধ্বংস হচ্ছে। তাছাড়া আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত, থাইল্যান্ড, বার্মা প্রভৃতি রাষ্ট্র আমাদের উপকূলীয় সীমানায় এসে মাছ। শিকার করে আমাদের মৎস্য সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি করছে। 

মৎস্য সম্পদ রক্ষার উপায় : আমাদের দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে মৎস্য সম্পদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাই আমাদের দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধিশালী রাখতে মৎস্য সম্পদ রক্ষা করা জরুরি। আমাদের দেশের মৎস্য সম্পদকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার প্রধান উপায় হলাে ভারতের সাথে গঙ্গার সুষম পানি বণ্টন চুক্তি কার্যকর করা । ছােটো মাছ ও ডিমওয়ালা মাছ শিকার নিষেধ করা এবং কঠোর আইন প্রণয়ন করা এবং প্রজনন মৌসুমে সকল প্রকার মাছ শিকার নিষিদ্ধ করা। কারেন্ট জাল ব্যবহারকারীকে পুলিশে দেওয়া এবং জরিমানা প্রদানে বাধ্য করা। রাসায়নিক সার এবং কীটনাশক ব্যবহারে সচেতন হওয়া। আমাদের উপকূল সীমানায় ভিনদেশের মৎস্য শিকারিদের মৎস্য শিকার সম্পূর্ণ বন্ধ করা। 

মৎস্য সম্পদ রক্ষায় সরকারি উদ্যোগ : বাংলাদেশের মৎস্য সম্পদকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে সরকারের বিশেষ উদ্যোগ লক্ষণীয়। মৎস্য সম্পদ রক্ষা করতে ও মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সরকার ইতােমধ্যে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকার মৎস্য চাষ বৃদ্ধির জন্য মৎস্য চাষিদের ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করেছে। এতে আত্মকর্মসংস্থানের পাশাপাশি বেকারত্ব দূর হবে। মৎস্য চাষিদের জন্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মৎস্য চাষের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। ডিমওয়ালা মাছ, জাটকা মাছ শিকার রােধ করতে প্রজনন মৌসুমে মাছ শিকার নিষিদ্ধ করেছে এবং কারেন্ট জাল নিষিদ্ধ করাসহ ব্যবহারকারির জরিমানার ব্যবস্থা করেছে। 

উপসংহার : আমাদের জাতীয় সম্পদগুলাের মধ্যে মৎস্য অন্যতম। ঐতিহ্যগতভাবে বাঙালিরা মৎস্য সম্পদের সাথে জড়িয়ে আছেযা মাছে ভাতে বাঙালি হিসেবে প্রাচীন প্রবাদেও প্রকাশ পেয়েছে। কারণ ভাত ও মাছ বাঙালির খাদ্য তালিকার প্রধান খাদ্য। শুধু তাই নয়, মাছ আমাদের দেশের আর্থিক উন্নয়নের অন্যতম উৎস, যা থেকে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হচ্ছে। মাংসের দুস্প্রাপ্যতা, দুর্মূল্যের কারণে কেবল মাছই ‘গরিবের আমিষ’ বলে খ্যাতি লাভ করেছে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে আমাদের দেশের এ সম্পদ প্রায় বিলুপ্তির পথে। তাই এই অমূল্য সম্পদ রক্ষা করতে আমাদের সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলাে বাস্তবে পরিণত করতে হবে।

Rate this post