আমেরিকান মনােবিদ  বি এফ স্কিনার ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে National Academy of science নামক পত্রিকায় অপারেন্ট অনুবর্তনের ধারণা দেন। তিনি বলেন, দু-ধরনের আচরণের কথা一

(১) প্রতিক্রিয়ামূলক আচরণ: যেসকল আচরণে নির্দিষ্ট উদ্দীপক বর্তমান, যেমন— খাদ্য দেখে কুকুরের লালাক্ষরণ, তীব্র আলােয় চোখ বুজে ফেলা ইত্যাদি।

(২) স্বতঃক্রিয়ামূলক আচরণ: যেসকল আচরণের নির্দিষ্ট উদ্দীপক থাকে না, প্রাণীর অভ্যন্তরীণ অবস্থা, যেমন— চাহিদা, বেদনাদায়ক অনুভূতি, আনন্দদায়ক অনুভূতি ইত্যাদির দ্বারা নির্ধারিত হয় তাকে বলে অপারেন্ট আচরণ।

এই দু-ধরনের আচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দু-ধরনের অনুবর্তন হয়, যথা

  • S-type Conditioning: এটি উদ্দীপক প্রধান প্রক্রিয়া, S বলতে উদ্দীপককে বােঝায়। এই জাতীয় অনুবর্তন প্রাচীন অনুবর্তন ক্রিয়ার অন্তর্গত। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এর উদাহরণ কম।
  • R-type Conditioning: R বলতে প্রতিক্রিয়াকে বােঝানো হয়েছে। এই ধরনের অনুবর্তনে কোনাে প্রতিক্রিয়া বা আচরণ নির্দিষ্ট উদ্দীপকের প্রভাবে সৃষ্টি হয় না, এটি সক্রিয় অনুবর্তনের অন্তর্গত। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এর উদাহরণ অনেক রয়েছে।

সক্রিয় অনুবর্তনের পরীক্ষা

স্কিনার তার মতবাদটি পরীক্ষার মাধ্যমে উপস্থাপন করতে ইঁদুর ও পায়রা নিয়ে অনেকবার গবেষণা করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি বিশেষ পরীক্ষা কৌশল ও যান্ত্রিক পদ্ধতি ব্যবহার করেন।

(১) পরীক্ষার উপকরণ: স্কিনার তার সক্রিয় অনুবর্তনের পরীক্ষার জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত স্কিনার বক্স, একটি ট্রে, কিছু খাদ্যবস্তু এবং কিছু আনুষঙ্গিক উপকরণ নিয়েছিলেন।

(২) স্কিনার বক্স: স্কিনার তার পরীক্ষার জন্য বক্সটি বিশেষ যান্ত্রিক কৌশল প্রয়ােগ করে তৈরি করেছিলেন। এই বাক্সের সঙ্গে একটি সরল যান্ত্রিক ব্যবস্থা থাকে। বিজ্ঞানভিত্তিক বৈদ্যুতিক যান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রাণীর আচরণ রেকর্ড করা হয়। একটি বােতাম বা লিভার থাকে। কোনাে প্রাণী বােতাম বা লিভারটিতে চাপ দিলে তার সামনে একটি ট্রেতে খাদ্যবস্তু এসে পড়বে। সরল যান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রাণী নির্ভুলভাবে কার্য সম্পাদনের জন্য পরীক্ষার মুখােমুখি হয়।

(৩) পরীক্ষা:

  • স্কিনার পরীক্ষার জন্য যে স্কিনার বক্স তৈরি করেছিলেন, সেখানে ক্ষুধার্ত হঁদুরটি প্রবেশ করিয়ে এবং ট্রেতে কিছু খাবার দিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন। ইঁদুরটি খাদ্যগ্রহণ করে এবং পরীক্ষামূলক পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত হয়। এক্ষেত্রে বােতামে চাপ দিয়ে খাদ্যবস্তু আনা হয়নি।
  • পরবর্তী দিন ক্ষুধার্ত ইঁদুরটিকে বক্সের মধ্যে প্রবেশ করানাে হল, কিন্তু ট্রেতে আগে থেকে কোনাে খাদ্যবস্তু দেওয়া হয়নি। এক্ষেত্রে স্কিনার নিজে বােতামে চাপ দিয়ে বাইরে থেকে খাদ্যবস্তু ট্রেতে আনেন এবং ইঁদুরটি খেয়ে ফেলে। এই পর্যায়ে ইঁদুরটিকে বক্সের বিভিন্ন পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচয় করানাে হয়।
  • এই পর্যায়ে ইঁদুরটিকে বেশ কিছুদিন খেতে না দিয়ে বক্সের মধ্যে প্রবেশ করানাে হয়। এক্ষেত্রেও আগে থেকে কোনাে খাদ্যবস্তু রাখা হয়নি বা স্কিনার বােতামে চাপ দিয়ে বাইরে থেকে কোনাে খাদ্যবস্তু আনেননি। খাদ্যের প্রত্যাশায় হঁদুরটি ট্রের দিকে এগিয়ে যায়, কিন্তু কোনাে খাদ্যবস্তু পায়নি। খাদ্যবস্তু না পেয়ে খাদ্যের প্রত্যাশায় বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়ামূলক আচরণ করতে করতে লিভারে বা বােতামে চাপ দিয়ে ফেলে এবং খাদ্যবস্তু ট্রেতে এসে যায়। ক্ষুধার্ত ইঁদুরটি খাদ্যবস্তু গ্রহণ করে।
  • এরপর স্কিনার সমগ্র প্রক্রিয়াটির সেই ইদুরটিকে নিয়েই পুনরাবৃত্তি ঘটান। পুনরাবৃত্তির ফলে একসময় ইঁদুরটি বাক্সের মধ্যে প্রবেশ করানাের সঙ্গে সঙ্গে লিভারে চাপ দিয়ে খাদ্যবস্তু আনতে সক্ষম হয়েছে। অর্থাৎ লিভারে চাপ দেওয়া ও খাদ্যবস্তু পাওয়ার মধ্যে ইদুরের মধ্যে অনুবর্তন সৃষ্টি হয়েছে।

সিদ্ধান্ত : স্কিনার এই পরীক্ষা থেকে সিদ্ধান্তে আসেন যে, প্রাণীরা অনেক সময় কিছু প্রতিক্রিয়া করে যার নির্দিষ্ট উদ্দীপক থাকে না। যেমন— ইদুরের ক্ষেত্রে ছিল না। ইঁদুরটি খাদ্যের প্রত্যাশা থেকে লিভারে চাপ দিয়েছে। খাদ্যের প্রত্যাশা থেকে ইঁদুরের মধ্যে শক্তিদায়ক সত্তা (Reinforcer) লিভারে চাপ দিতে বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। পরবর্তীকালে স্কিনার অপারেন্ট শ্রেণির আচরণগুলিকে আর-টাইপ (R type) অনুবর্তন বলেছেন, কারণ এটি প্রতিক্রিয়া (Response) প্রধান অনুবর্তন।

Rate this post