বহিরাগত বর্বর শত্নুদের আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষার উদ্দেশ্যে মধ্যযুগের ইউরােপে সামন্ততন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। মধ্যযুগের বেশ কিছু ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ করা যায়। এগুলি হল一
[1] নিরাপত্তা বিধান: সামন্ততান্ত্রিক কাঠামাের মধ্যে রাজা বর্বর আক্রমণকারীদের হাত থেকে জীবন ও সম্পত্তি রক্ষার জন্য সাধারণ মানুষের একমাত্র ভরসা ছিল তার সামন্তপ্রভু।
[2] শান্তি প্রতিষ্ঠা: সামন্ততন্ত্র ইউরােপে পূর্বতন অস্থিরতা ও অশান্তি দূর করে শাস্তি, সুস্থিতি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। এর ফলে প্রভুর শােষণ থাকলেও মানুষ নিজ এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারত।
[3] সমাজজীবনে সচলতা রক্ষা: সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় কৃষক ও ভূমিদাসদের উৎপাদনের কাজ ব্যবহার করে কৃষি ও অন্যান্য উৎপাদনমূলক কাজগুলিকে সচল রাখার ফলে ইউরােপের জীবনযাত্রায় স্বাভাবিক ছন্দ এসেছিল।
[4] শিল্পরীতির বিকাশ: সামন্তপ্রভুরা নিরাপত্তার প্রয়ােজনে দুর্গ নির্মাণ শুরু করলে প্রাচীন রােমান স্থাপত্যরীতির সঙ্গে মধ্যযুগীয় গথিক শিল্পরীতির সংমিশ্রণে ইউরোপে নতুন ধরনের স্থাপত্যশিল্পের বিকাশ ঘটে।
[5] শিক্ষার প্রসার: সামন্ততান্ত্রিক যুগে যাজক সম্প্রদায়ের পরিচালনায় এবং চার্চের তত্ত্বাবধানে ইউরােপের বিভিন্ন প্রান্তে নতুন নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। ফলে নবম শতক থেকে ইউরােপে নতুন করে জ্ঞানচর্চা শুরু হয়। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে দ্বাদশ শতক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠতে থাকে।
[6] শিভালরির আদর্শ প্রতিষ্ঠা: বীরত্বের আদর্শ বা শিভালরির ধারণা গড়ে উঠেছিল। শিভালরি এযুগের ইউরােপের সাধারণ মানুষকে মূল্যবােধ, ভদ্রতা, নারীর সম্মান রক্ষা প্রভৃতি আদর্শে অনুপ্রাণিত করেছিল। এজন্য শিভালরিকে বলা হয় সামন্ততন্ত্রের পুষ্প।
[7] স্বয়ংসম্পূর্ণ ম্যানর ব্যবস্থা: মধ্যযুগের ভেঙে-পড়া যােগাযােগ ব্যবস্থায় পণ্যসামগ্রী দূরে পাঠানো কষ্টসাধ্য ছিল। এই পরিস্থিতিতে সামন্ততন্ত্রের মাধ্যমে স্বয়ংসম্পূর্ণ ম্যানর বা গ্রামগুলি গড়ে উঠলে মানুষের সুবিধা হয়েছিল।
ইউরােপে সামন্ততান্ত্রিক কাঠামাের ইতিবাচক দিকগুলির পাশাপাশি কতকগুলি নেতিবাচক দিকও ছিল। সেগুলি হল一
[1] বৈষম্যমূলক অধিকার: সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় সামন্তপ্রভু ও অভিজাতরা সমাজের সকল অধিকার ভােগ করলেও সাধারণ মানুষের তা ভােগ করার অধিকার ছিল না।
[2] অর্থনৈতিক বৈষম্য: সামন্তসমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল প্রবল। ধনী সামন্তপ্রভু ও অভিজাতরা ছিল অত্যন্ত ধনী এবং কৃষক ও ভূমিদাসরা ছিল অত্যন্ত দরিদ্র। বিবিধ করের বােঝা, বেগারপ্রথা প্রভৃতি দরিদ্রশ্রেণির মানুষের জীবনে গাঢ় অন্ধকার নিয়ে এসেছিল।
[3] বলপ্রয়ােগ: পেশিশক্তি ছিল সামন্ততান্ত্রিক সমাজের সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রধান উৎস। নিজেদের গুরুত্ব প্রমাণ করতে সামন্তপ্রভুদের মধ্যে প্রতিনিয়ত ‘ডুয়েল’ বা লড়াই চলত। শক্তি প্রদর্শনের অবিরাম প্রয়াস সমাজকে অশান্ত করে তুলেছিল।
[4] পশ্চাদগামিতা: সামন্ততান্ত্রিক যুগের অনুন্নত কৃষিপ্রযুক্তি, পিছিয়ে-পড়া শ্রমবিভাজন পদ্ধতি প্রভৃতির ফলে কৃষি উৎপাদন খুবই কম হত। শুধু গ্রাম-সমাজের প্রয়োজনে উৎপাদন কাজ চলত বলে একদিকে বাণিজ্যের উন্নতি যেমন বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিল। অন্যদিকে তেমনি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে খাদ্যসংকট দেখা দিত। এযুগের অর্থনীতি জমিকেন্দ্রিক আঞ্চলিক গণ্ডিতে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিল।
[5] ভূমিদাসদের জীবনযন্ত্রণা: সামন্ততন্ত্রে ভূমিদাসদের জীবন ছিল এককথায় পশুর জীবন। সীমাহীন পরিশ্রম করেও অনাহার, অর্ধাহার, শারীরিক নির্যাতন প্রভৃতি ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী।
উপসংহার: মধ্যযুগে সামন্ততন্ত্র যেমন একদিকে তাৎক্ষণিক অস্থিরতা থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রকে রক্ষা করে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেছিল, অন্যদিকে তেমনি সামন্ততন্ত্রের নেতিবাচক প্রভাবগুলির ফলে এর অবক্ষয়ও শুরু হয়েছিল।
Leave a comment